‘এলোকেশী কন্যা’- [০৩]

0
514

-‘এলোকেশী কন্যা’-
[০৩]
লেখনীতে:- নূরজাহান আক্তার (আলো)

মেঘ ভয়ে চিৎকার করে উচ্চশব্দে কাঁদছে। আর ওর চিৎকারে জঙ্গিদের উল্লাসটা যেন দ্বিগুন হারে বেড়ে যাচ্ছে। রোদ কম্পিত হাতে ওর ওয়ালেট আর ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনাদের যা লাগে নিয়ে যান। তাও আমাদের ছেড়ে দেন, প্লিজ! আই সোয়্যার আমরা আপনাদের কথা কাউকে বলব না।”
জঙ্গিরা রোদের কথা না বুঝে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রোদ আঁকুতি ভরা কন্ঠে বার বার বলছে ওদের ছেড়ে দিতে। মেঘ ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে নেতিয়ে পড়েছে। একজন জঙ্গি রোদের ওয়ালেট আর ফোন’টা থাবা দিয়ে কেড়ে নিলো। তারপর মুখে অদ্ভুত শব্দ করে দুই ভাইকে জোর করে ওদের অস্তানায় নিয়ে গেল। পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে তাদের আস্তানা। সেখানে কয়েকটা তাবু টানিয়ে দু’একটা মশাল জ্বালানো। ওরা পাহাড়ে বসবাস করলেও এক পাহাড়ে কখনো স্থায়ী ভাবে থাকে না। মশালের আবছা আলোতে দেখা গেল, জঙ্গিদের মুখে কালি দিয়ে আঁকিবুঁকি করা আর চামড়ার পোশাক। অদ্ভুত তাদের ভাষা! কয়েকজন অর্ধ নগ্ন মেয়েকেও সেখানে দেখা গেল। যুবতী মেয়েদের উপরে অংশে চামড়ার পোশাক থাকলেও মধ্য বয়স্কদের কিছু নেই। অথচ তারা দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের মাঝে এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে নি। ওরা এখনো আদিম যুগের সংস্কৃতিতেই সীমাবদ্ধ। তাছাড়া মানুষের মাংস খেয়েও ওরা অভ্যস্ত। আজ দু’টো মানুষ পেয়ে তাই তাদের এত উল্লাস। রোদের জানামতে এরা খুব হৃদয়হীন এবং ভয়ংকরও বটে। কয়েকজন মাঝ বয়সি মহিলা এসে ওদের সামনে দাঁড়াল। উনাদের পোশাক দেখে রোদ মেঘ দু’জনেই দৃষ্টি সরিয়ে মাথা নিচু করে নিলো। তখন আরো কয়েকজন জঙ্গি উপস্থিত হয়ে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। রোদ নিজের প্রাণের ভয় পাচ্ছে না, কিন্তু মেঘ? রোদ ঘাড় ঘুরিয়ে মেঘের দিকে তাকাল। সে এখনো গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রোদকে তাকাতে দেখে মেঘ আঁকুতি ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। এই দৃষ্টি যেন চিৎকার করে বলছে,”দাভাই আমি ভয় পাচ্ছি! আমাকে বাঁচাও!
রোদের হাতেও কিছু করার নেই। ওরা এখন এই পরিস্থিতির স্বীকার। মেঘকে দেখে কষ্টে রোদের বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। তাই সে দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে তাকাতেই ওর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গেল। তখন দুইজন এসে ওদের’কে দুরত্ব রেখে গাছের সাথে বাঁধল। শক্ত করে বাঁধার জন্য মেঘ ছটফট করে বলল,
“আমি খু্ব ব্যাথা পাচ্ছি আঙ্কেল। উফ! আমার হাতে খুব লাগছে। আঙ্কেল প্লিজ একটু আস্তে বাঁধুন।”
“ওর হাতটা খুলে দেন। আমাকে আরো কষ্ট দেন তবুও ছোট বাচ্চাটাকে আর কষ্ট দিয়েন না। এই যে শুনছেন? আমার অনুরোধ’টা প্লিজ রাখুন।”
মেঘ ব্যাথায় ছটফট করে কাঁদছে। জঙ্গি দু’টো ওদের কথা বুঝতে না পেরে শব্দহীন পায়ে চলে গেল। ব্যাথার চোটে মেঘের কান্নার বেগ বাড়তে লাগল। মেঘকে কাঁদতে দেখে একটা মেয়ে এসে স্বজোরে মেঘের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। রোদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কোনোদিন ভুলেও মেঘকে ফুলের টোকা দেয়নি। আর আজ ওর সামনে ওর কলিজা’টার গায়ে মেয়েটা হাত তুলল। রোদ আদুরে সুরে বার বার মেঘকে কাঁদতে নিষেধ করছে। শক্তপোক্ত হাতের থাপ্পড়ে মেঘের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে। মনে হচ্ছে ফর্সা গাল থেকে এক্ষুণি রক্ত গড়িয়ে পড়বে। মেঘের কান্না থামছে না দেখে মেয়েটা মেঘের মুখে গাছের পাতা গুঁজে দিলো। মেঘ বমি করতে গেলে মেয়েটা আরো জোর করে মুখে পাতা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মেঘ এবার ছটফট করলে মেয়েটা শক্ত করে মেঘের নাক চেপে ধরল। নিঃশ্বাস নিতে না পেরে মেঘ অস্থির হয়ে কাটা মুরগির মতো দাপাদাপি করতে লাগল।
রোদ মেয়েটাকে বার বার অনুরোধ করছে ওকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু সে শুনছে না। রোদ একপর্যায়ে অসহায় হয়ে অঝরে কাঁদতে লাগল। ওর কলিজাটা’র কষ্ট সে আর দেখতে পাচ্ছে না। নিঃশ্বাস না পেয়ে মেঘের চোখ উল্টো প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মেয়েটা মেঘের নাক ছেড়ে গাল চেপে ধরে শাসিয়ে চলে গেল। মেঘ মুখে পাতা নিয়ে অস্পষ্ট সুরে কী যেন বলছে। ওর চোখ দু’টো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘের করুণ অবস্থা দেখে রোদ ছটফট করে অসহায় কন্ঠে বলল,
“মেঘ! মেঘ সোনা আমার কলিজা’টা। ভাই একটু তাকাও আমার দিকে। এই মেঘ! দাভাই তোমাকে ডাকছে শুনবে না তুমি? আমি কষ্ট পাব তাহলে, এই মেঘ!”
মেঘের শরীর ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে আসছে। ভয়ে ওর মস্তিষ্কে অক্সিজেনের পরিমান কমে জ্ঞান হারানোর উপক্রম। রোদ ব্যাকুল হয়ে মেঘকে বার বার ডাকছে। কিন্তু মেঘের কোনো সাড়াশব্দ নেই।
তখন একটা মেয়ে এসে রোদের পায়ের কাছে বসে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে উঠতে উঠতে লাগল। মেয়েটা শ্বাস টেনে রোদের শরীরের গন্ধ নিচ্ছে। রোদ রাগ, ক্ষোভ, বিরক্ত আর অসহায়ত্ব নিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। মেয়েটা ওর সাথে অদ্ভুত আচরণ করছে। শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কখনো বা শার্টের কলার টেনে গলায় মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে। আবার কখনো বিশ্রী হেসে রোদের ঠোঁটে আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছে। আর এই মেয়েটার কান্ড দেখে বাকিরা নিকটে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে। রোদ চোখ বন্ধ করে মনে প্রাণে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থণা করছে। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া ওদের এই পরিস্থিতি থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। এরা নোংরা মস্তিষ্কের বদ্ধ উন্মাদ জঙ্গি। এরা শরীর নিয়ে খেলতে বেশ পছন্দ করে। এদের পোশাক আর ব্যবহার দেখে সেটা স্পষ্ট। তাছাড়া এরা মুসলিম ধর্মের নয়, এটাও নিশ্চিত!
মেয়েটা রোদের শার্টের বোতাম খুলতে গেলে রোদ অনবরত নড়ে বাঁধা সৃষ্টি করল। মেয়েটা রেগে নাক ফুলিয়ে শক্ত করে রোদের চুল খামচে ধরল। রোদ প্রচন্ড ব্যাথা পেলেও টু শব্দ করল না। রোদের জেদ দেখে মেয়েটা হেসে রোদের গালে ঠোঁট বুলালো। তারপর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের দিকে একবার তাকিয়ে শক্ত করে রোদের দুই চিবুক ধরে ঠোঁট স্পর্শ করল। তাৎক্ষণিক রোদ ওর ঘাড় ঘুরিয়ে বমি করতে লাগল। মেয়েটা দাঁতে আর ঠোঁটে কালো কী সব লেগে আছে। আর সেটা থেকে বিশ্রী একটা পঁচা গন্ধ আসছে। গন্ধটাতে রোদের পেটের নাড়ি-ভুঁড়িও মোচড় দিয়ে উঠছে।
জঙ্গি মেয়েরা কালো জিনিসটা লিপষ্টিক হিসেবে ব্যবহার করে। আর এটা বন্য শূকরের কলিজা বেটে রোদে শুকিয়ে তৈরী করা হয়। রোদে শুকানো পর কালো হয়ে গেলে ওরা ঠোঁটে লাগায়। এবং মনে করে এটা ঠোঁটে লাগালে পুরুষরা খুব সহজে ওদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কারণ ওদের জাতের পুরুষটা এটার জন্য পাগল।
কিন্তু রোদের বমি করা দেখে মেয়েটা প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে চলে গেল। তখন আরেকজন এসে মেঘের প্যান্ট খুলতে লাগল। মেঘ ছটফট করে উম উম শব্দ করে মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করছে। কিন্তু সে শুনল না। বরং পাত্র এগিয়ে ইশারায় মেঘকে প্রসাব করতে বলল। রোদ কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। মেঘ প্রসাব করছে না দেখে মেয়েটা রেগে একটা থাপ্পড় মারল। পুনরায় থাপ্পড় খেয়ে মেঘ ভয়ে আরো কুঁকড়ে গেল।
রোদ অন্য দিকে তাকিয়ে সমানে অঝরে অশ্রু ঝরাচ্ছে।নিজেকে এতটা অসহায় ওর কখনো লাগে নি। মেঘ চোখ বন্ধ করে প্রসাব করলে সেটা নিয়ে মেয়েটা চলে গেল। ওরা মদের সঙ্গে বাচ্চাদের প্রসাব মিশিয়ে পান করে। ওদের ভাষ্যমতে, ‘বাচ্চা হচ্ছে ঈশ্বরের আরেকটা রুপ। তাই বাচ্চাদের প্রসাবও খুব পবিত্র।’
তাছাড়া বাচ্চাদের প্রসাব খেলে নাকি শরীরের উন্মাদনা বৃদ্ধি পায়। এবং দীর্ঘদিন ধরে কাম শক্তি ধরে রাখা যায়। ওদের প্রসাব খাওয়া দেখে দুই ভাই আবার বমি করতে লাগল। বমি করতে করতে ওদের কাহিল অবস্থা। রক্তে মাংসে গড়া মানুষ যে এতটা নোংরা হয় ওদের জানা ছিল না। জঙ্গিরা গোল হয়ে বসে মদ খাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে কী সব আলোচনা করছে। ওদের দিকে তাকিয়ে রোদের ভয়টা ক্রমশ বৃদ্ধ পাচ্ছে। জঙ্গিরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলো, তারা আগে মেঘকে বলি দিবে। তারপর মেঘের পবিত্র রক্ত দিয়ে ওদের কাম দেবতার আরাধনা করবে। এবং মেঘের মাংস দিয়ে তৃপ্তি করে ভুরিভোজ করবে। তারপর কথা উঠল রোদকে নিয়ে।
রোদকে নিয়ে কিছু বলার আগে কয়েকজন মেয়ে তাদের ইচ্ছের কথা জানাল। কথাটা শুনে জঙ্গি ছেলেরা উচ্চশব্দে হেসে উঠল। রোদের মতো টগবগে যুবক পেয়ে মেয়েরা হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না। তাই তারা এই সুযোগের ফায়দা উঠাতে চাচ্ছে।
আলোচনায় বসে নোংরা মস্তিষ্কের মানুষ গুলো নোংরা পরিকল্পনা সমাপ্ত করল। তারপর ঠিক হলো রোদের সঙ্গে ওই মেয়েগুলো যথাশীঘ্রই ঘনিষ্ঠ হবে। তারপর তাকেও বলি দেওয়া হবে।
জঙ্গি প্রধান আঙ্গুলের ইশারায় অন্য জঙ্গিদের কিছু একটা বোঝাল। তখন দুইজন গিয়ে মেঘের হাতের বাঁধন খুলে দিলো। রোদ কিছু একটা আন্দাজ করে পেরে বার বার জিজ্ঞাসা করছে,
“ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কি হলো বলুন? মেঘ! মেঘ!”
ততক্ষণে মেঘের জ্ঞান হারানো শরীর মাটিতে লুটে পড়েছে। ওই দুইজন মেঘকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বলি কাঠে শুইয়ে দিলো। আর একজন এসে রোদের মুখটা কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলো। রোদ শত চেষ্টা করেও আর কিছু বলতে পারছে না। শুধু পানি ছাড়া মাছের মতো দাঁড়িয়ে অসহায় ভাবে ছটফট করছে। তারপর স্বজোরে পানি ছুঁড়ে মেরে মেঘের জ্ঞান ফেরানো হলো। মেঘ ওর সামনের জনের হাতে ধারালো রামদা দেখে ভয় থরথর করে কাঁপছে। রামদা ধরা ব্যাক্তি বাঁকা হেসে মেঘের আঙ্গুলে পোজ দিলো। আর সেই পোজে মেঘের আঙুল কেটে গলগল করে রক্ত গাড়িয়ে গেল। মেঘ ব্যাথায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল। এতটুকু দেখে রোদের মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

To be continue……..!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here