চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_১২

 চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_১২

চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️
পর্ব_১২
#লেখনীতে-নন্দিনী নীলা

টাকা আজ আমাকেই দিতে হলো। আমাকে আর সিনথি কে স্পর্শ নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিল। নিঝুম ধারা মিষ্টি চলে গেল রেস্টুরেন্টে থেকে।
স্পর্শের সাথে আমার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু তিনি আমাকে জোর করে গাড়িতে তুলেছেন। আমি ভেবেছিলাম স্পর্শ আমার সাথে মজা করছে টাকাটা নিজেই দিবে কিন্তু না আমাকেই দেওইয়েছে।
বিয়ের পর শশুর বাড়ী এখনো যায়নি। এক মাস হলো কেউ আমাকে নিতে আসে নি। আমি মনে মনে পরিকল্পনা করে রেখেছি আমি আর যাব না ওই বাসায়। আগে তো হবু ব‌উ ছিলাম এখন আর তা না। একেবারে তুলে না নিলে যাব না। কিন্তু আমার কপাল খারাপ সব সময়ই কারণ আমি যেটা ভাবি তার উল্টোটাই সব সময় আমাদের বাড়িতে হয়। আমি যেই ভাবলাম এখন আর এই কয়েকমাস যাব না সেই মুহূর্তে খবর পেলাম আমাকে ওই বাসায় যেতে হবে আমাকে নিতে আসছে আমার এক মাত্র ননদ সীফা।
তখন আরেকটা সুখবর পেলাম মোহিনী ভাবি প্রেগন্যান্ট। সেই খবর পেয়ে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে আছে। ছোট খাঁটো পার্টির আয়োজন করেছে সবাই বাড়িতেই।

ভাবির খবর পেয়ে খুব খুশি হলাম। কিন্তু যাওয়ার জন্য রাজি হতে পারছি না। কিন্তু যাওয়া দরকার আগে তো সব সময় কিছু না কিছু হলেই যেতাম। এখন না খেলে কেমন দেখা যায় ব্যাপারটা। স্পর্শের উপর রাগ করে না যাওয়াটা খুবই খারাপ হবে।

বোরকা আর হিজাব করে রেডি হয়ে নিলাম। সীফাকে আম্মু খেতে টানাটানি করছে সীফা কিছু খাচ্ছে না। আমি আসতেই তাদের টানাটানি থাকলো। সীফা আমার কাছে এসে বলল,

‘ ভাবি চলো এবার‌। আন্টি আমাকে বিপদে ফেলছিলো প্রায়। আমি খেয়ে আসছি এখন কিচ্ছু টি খেতে পারবো না। তবুও আন্টি জোর করছে।’

আমি বললাম, ‘ আম্মু খেতে না চাইলে জোর কেন করছো। আমি ও তো খেয়েই যাচ্ছি ওখানে গিয়ে আমিও কিছু খাব না‌। তখন সীফা আমাকে বাঁচাবে তাই না।’

সীফা গাল ফুলিয়ে বলল, ‘ ভাবিইইইই তুমি আমাকে বাচাচ্ছ নাকি ফাসাচ্ছ?

‘ বাঁচিয়ে দিচ্ছি।’

‘ নো। ওকে আমি একটু খানি খাব।’

‘ খাও।’

সীফা চেয়ার টেনে বসে একটু খেলো তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ হবে?’

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। তারপর দুজনে বেরিয়ে পরলাম।

গাড়িতে বসে সীফা বলল, ‘ ভাবি বিয়ের পর প্রথম বার শশুর বাড়ি যাওয়ার ফিলিংস কেমন তোমার?’

আমি বললাম, ‘ কোন ফিলিংস তো পাচ্ছি না।’

‘ ভাইয়া নাই বলে কি পাচ্ছ না। ভাইয়াকে আনিয়ে দেবো?’

‘ দরকার নাই।’

‘ শুনলাম তুমি ভাইয়ার উপর খুব রাগ করেছো?’

‘ কে বলল?’

‘ কে আবার তোমার উনি।’

‘ আমি কারো উপর রাগ করিনি।’

‘ সত্যি?’

আমি কিছু বললাম না। সীফা কাকে যেন কল করলো আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম তাই লক্ষ্য করিনি। কিন্তু সীফার কথা শুনে বুঝতে টাইম
লাগলো না কার সাথে কথা বলছে।

‘ ভাইয়া ভাবিকে আমি নিয়ে আসছি তুমি আসো। ভাবি খুব মিস করছে তোমাকে।’

গরগর করে কথা বলে রেখে দিল আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছি সীফার দিকে।

‘ তুমি মিথ্যা বললে কেন?’

‘ কোথায় মিথ্যা বললাম!’

‘ আমি উনাকে মিস করছি এটা বললে কেন? আমি কখন উনাকে মিস করলাম।’

‘ করছো মনে মনে আমি জানি।’

‘ কচু জানো তুমি। ‘

শশুর বাড়ি আসার আগেই স্পর্শ হাজির হলো। তিনি তার গাড়ি নিয়ে এসেছে। আমি শক্ত করে হাত ধরে আছি সীফার। এর অবশ্য কারণ আছে স্পর্শ তার সাথে আমাকে যেতে বলছে। কিন্তু আমি রাজি না এজন্য দুই ভাই বোন আমাকে যাওয়ার জন্য অনেক কথাই বলছে। রাজি করানোর চেষ্টা করছে।দাঁতে দাঁত চেপে রাগ কন্ট্রোল করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। স্পর্শের মুখের রাজ্য জয় করার হাসি।

আমি রাগী চোখে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বললাম,’ সীফা তার মানে মিথ্যা বলে নিয়ে এসেছে আমাকে?’

স্পর্শ ড্রাইভ করতে করতে বলল, ‘ কিসের মিথ্যা?’

‘ ওই বাসায় ভাবি প্রেগন্যান্ট, অনুষ্ঠান এসব মিথ্যা। আপনি প্লান করে আনিয়েছেন আমাকে!’

স্পর্শ আমার কথা শুনে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ বোকা। আমি তোমাকে মিথ্যে বলে আনতে যাব কেন? আমি চাইলেই তো তোমার সাথে লং ড্রাইভে যেতে পারি। বিকজ তুমি আমার বউ।’

‘ ব‌উ বলে যা খুশি তাই করবেন। আমি আসতে চাইলাম না তাও জোর করে আনলেন কেন।’

‘ জোর করার ইচ্ছা ছিল না। আমি সব সময় তোমার উপর জোর চালাতে চাই না। কিন্তু আজ করলাম‌ কারণ আজ আমি আমার এই ‘চড়ুইপাখির অভিমান’ ভাঙাতে চাই।’

‘ হোয়াট চড়ুইপাখির টা আবার কে?’ কপালে ভাঁজ ফেলে বললাম।

স্পর্শ আমার গাল টেনে দিয়ে বলল, ‘ কেউ না।’

আমি স্পর্শের হাতের স্পর্শ পেয়ে থমকে চুপ মেরে আছি। হুটহাট এমন ভাবে স্পর্শের স্পর্শ করা আমার মনে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

স্পর্শ আমাকে নিয়ে এলো এক নিরিবিলি পরিবেশে। একটা ফুলের বাগান এটা দূর থেকেই আমি হাজারো ফুলের সমাহার দেখতে পাচ্ছি। চোখ কপালে তুলে আমি ফুল দেখছি। এটা কোথায় এলাম তাই আমি ভাবছি।হাজারো ফুলের সমাহার। ফুল আমার অতি প্রিয়। ফুলের উপর আমার দূর্বলতা কাজ করে। আমি স্পর্শের কথা ভুলে লাফাতে লাফাতে ফুলের বাগানে চলে গেলাম। অনেক ধরনের ফুল আছে। এখানে ফুলের চাষ হয় নাকি। আমি পার্সে থেকে ফোন বের করে ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। কিন্তু মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল আগে যদি জানতাম এমন একটা জায়গায় আসবো তাহলে তো আমি এই বোরিং বোরকা টা পরে আসতাম না।
একটা ফুল টপ করে ছিড়ে নিলাম। তারপর লুকিয়ে ফেললাম। কার না কার বাগান ফুল ছিঁড়তে দেখে যদি আবার আমাকে বেঁধে রাখে।

‘ এটা কি করলে? ফুলটা নষ্ট করে দিলে। গাছেই তো এটা সুন্দর ছিল। একটু পর নষ্ট হয়ে যাবে আর ফেলে দিবে অযথা ছিঁড়ে নষ্ট করে দিলে।’

গম্ভীর ভরাট গলায় স্পর্শের কথা শুনে ঢোক গিলে পিছনে তাকালাম।

‘ আমার ফুল খুব পছন্দ তাই একটাই নিলাম। আপনি বকছেন কেন? এই বাগানের মালিক, বা কাউকে বলেন না কিন্তু আমি ফুল ছিড়েছি। আমাকে খুব বকা দিবে।’

‘ মালিক তো আমিই।’

‘কিহহ আপনি? এটা আপনার বাগান।’

‘ ইয়েস।’

‘ সত্যি?’ উত্তেজিত হয়ে বললাম।

‘ আরে বাবা হ্যা।’

‘ আগে বলবেন না এটা আপনার। এতোক্ষণ কতো ভয়ে ভয়ে ছিঁড়তে হয়েছে ধরতে হয়েছে জানেন। এটা তো‌ আমার হাজব্যান্ড এর ই আমি ছিঁড়লে কি হবে।’

বলেই আমার পছন্দ মতো ফুল ছিড়লাম তিনটা গোলাপ।সাদা, লাল, গোলাপি।

আর স্পর্শ কে মনে মনে গালি দিলাম দূরে দাঁড়িয়ে। স্পর্শ আমায় একটু ও ভালো বাসে না আমার মন বুঝার চেষ্টা‌ই করে না। ওই যে দূরে দাঁড়িয়ে কেমন বারণ করতেছে ফুল ছিঁড়তে ফাজিল লোক একটা‌ কোথায় নিজে ফুলের তোড়া বানিয়ে আমাকে দিয়ে প্রপোজ করবে ভালোবাসি বলবে, রাগ ভাঙাবে তা না আরো রাগিয়ে দিচ্ছে। ভেবেছিলাম আজ বোধহয় রাগ ভাঙিয়ে ছাড়বেই কিন্তু লোকটা একটুও রোমান্টিক না।

আমি স্পর্শের থেকে চোখ সরিয়ে তিনটা ফুল ঘুরাতে ঘুরাতে হাঁটতে লাগলাম। অনেক বড় এই বাগানটা‌। অনেক মালি আছে দেখা যাচ্ছে আমি হাঁটছি আর দেখছি। হঠাৎ বড় বড় পা ফেলে দৌড়ে কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমি তাকানোর আগেই লোকটা আমার মাথায় কিছু পরিয়ে দিল। আমি জানি লোকটা কে তিনি হলো স্পর্শ। তিনি আমাকে থামতে বলেই দৌড়ে আমার কাছে এসেছে। আমি শুনেও না শুনার ভান করে হেঁটেছি। নিশ্চয়ই ফুলের জন্য বকবে তাই আরো থামি নি। কিন্তু একি একা কাজ হলো স্পর্শ একটা ফুলের বান এনে আমার মাথায় গোল করে পরিয়ে দিল আমি হতভম্ব হয়ে স্পর্শের চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।
স্পর্শের মুখে হাসি‌। স্পর্শ আমাকে না মুখে ভালোবাসি বলল, আর না হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করলো। শুধু মাত্র ফুলটাই আমার মাথায় পরিয়ে এলো এতেই আমার রাগ উবে গেল। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম। লোকটা আমাকে সামান্য উপহার দিয়েই গায়েল করে দিল। আমি সেই আগের মতো উনাতে মগ্ন হয়ে গেলাম।

বাগানে থেকে আসার আগে স্পর্শ আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ আমার চড়ুইপাখির অভিমান কি ভেঙেছে?’

আমি তখন বুঝতে পারলাম লোকটা আমাকেই চড়ুইপাখির বলেছে। আমি তখন শুধু লজ্জা মিশ্রিত মুখে মুচকি হেসেছি।

রাগ অভিমান ভাঙিয়ে স্পর্শ আমাকে নিয়ে শশুর বাড়ি এলো।

#চলবে…

Digiqole Ad

Related post

Leave a Reply

Your email address will not be published.