চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_১৭

 চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_১৭

চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️
পর্ব_১৭
#লেখনীতে_নন্দিনী_নীলা

নিঝুম ঝকঝকে দুপুর। তটিনীর কূলে ডেকে যায় একলা ডাহুক। এমন নিস্তব্ধ দুপুরে শুধু নৌকার বৈঠা শব্দ করছে ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল। এমনই এক ঘোর মাখা সময়েই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম বাংলার অ্যামাজন নামে পরিচিত সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুলে।

রাতারগুল আমাদের দেশের একমাত্র ‘ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট’ বা জলাবন। সিলেট থেকে দেশের একমাত্র স্বীকৃত এই সোয়াম্প ফরেস্টের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ইউনিয়নে এই জলাবনের অবস্থান।

উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী গোয়াইন নদী, দক্ষিণে বিশাল হাওর। মাঝখানে ‘জলাবন’ রাতারগুল(Ratargul Jolabon)। উইকিপিডিয়ায় পাওয়া তথ্যমতে সারা পৃথিবীতে স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশ আছে এর দুটি, একটা শ্রীলংকায় আর আরেকটা আমাদের রাতারগুলে।

অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ বনের সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র অ্যামাজনের। রেইন ফরেস্ট নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের স্বাদুপানির সবচাইতে বড় সোয়াম্প বন কিন্তু ওই অ্যামাজনই। ঠিক অ্যামাজন সোয়াম্পের মতোই স্বাদুপানির বন আমাদের এই রাতারগুল।

সিলেটের স্থানীয় ভাষায় মুর্তা বা পাটিগাছ ‘রাতাগাছ’ নামে পরিচিত। সেই মুর্তা অথবা রাতাগাছের নামানুসারে এই বনের নাম হয়েছে রাতারগুল। অ্যামাজনের মতোই গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশই বছরে চার থেকে সাত মাস থাকে পানির নিচে। ভারতের মেঘালয়ের জলধারা গোয়াইন নদীতে এসে পড়ে, আর সেখানকার এক সরু শাখা চেঙ্গী খাল হয়ে পানিটা প্লাবিত করে পুরো রাতারগুল জলাবনকে। বর্ষা মৌসুমের প্রায় সবসময়ই পানি থাকে বনে ( মে – সেপ্টেম্বর)। শীতকালে অবশ্য সেটা হয়ে যায় আর দশটা বনের মতোই, পাতা ঝরা শুষ্ক ডাঙ্গা। আর ছোট ছোট খালগুলো হয়ে যায় পায়েচলা মেঠোপথ। আর তখন জলজ প্রাণীকুলের আশ্রয় হয় বন বিভাগের খোঁড়া বড় বড় ডোবাগুলোতে।

বর্ষায় বড়ই অদ্ভুত এই জলের রাজ্য। কোনো গাছের কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলো আবার শরীরের অর্ধেকই ডুবিয়ে আছে জলে। কোথাও চোখে পড়বে মাছ ধরার জাল পেতেছে জেলেরা। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন যেন অন্ধকার লাগবে পুরো বনটা। মাঝেমধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দিবে পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে পথ চলতে হয়। তবে বর্ষায় এ বনে চলতে হবে খুব সাবধানে। কারণ রাতারগুল হচ্ছে সাপের আখড়া। বর্ষায় পানি বাড়ায় সাপেরা ঠাঁই নেয় গাছের ওপর।

বনবিভাগের তথ্যমতে- এই বনের আয়তন তিন হাজার ৩২৫ দশমিক ৬১ একর। এর মধ্যে ৫০৪ একর বন ১৯৭৩ সালে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। বিশাল এ বনে রয়েছে জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ। মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও বেত, কদম, হিজল, মুর্তাসহ নানা জাতের পানি সহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে বন বিভাগ। রাতারগুল বনে সাপের মধ্যে নির্বিষ গুইসাপ, জলঢোড়া ছাড়াও রয়েছে গোখরাসহ বিষাক্ত অনেক প্রজাতি। বর্ষায় বনের ভেতর পানি ঢুকলে এসব সাপ উঠে পড়ে গাছের ওপর।

বনের ভেতর দাঁপিয়ে বেড়ায় মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোঁদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী। টেংরা, খলিশা, রিঠা, পাবদা, মায়া, আইড়, কালবাউস, রুইসহ আরো অনেক জাতের মাছ পাওয়া যায় এই বনে। পাখিদের মধ্যে আছে সাদা বক, কানি বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল ও বাজ। শীতে মাঝেমধ্যে আসে বিশালকায় সব শকুন। আর লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ঘাঁটি গাড়ে বালিহাঁসসহ হরেক জাতের পাখি। শুকনো মৌসুমে ডিঙ্গি নিয়ে ভেতরে গেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আপনাকে উড়ে সরে গিয়ে পথ করে দেবে। এ দৃশ্য আসলেই দুর্লভ!

গাছের মধ্যে এখানে করচই বেশি। হিজলে ফল ধরে আছে শয়ে শয়ে। বটও চোখে পড়বে মাঝেমধ্যে। আর বনের দক্ষিণে মুর্তা (পাটি) গাছের প্রাধান্য। রাতারগুলের বেশ বড় একটা অংশে বাণিজ্যিকভাবে মুর্তা লাগিয়েছে বন বিভাগ। মুর্তা দিয়ে শীতল পাটি হয়। মুর্তা বেশি আছে নদীর উল্টো পাশে। এ ছাড়া ওদিকে শিমুল বিল হাওর আর নেওয়া বিল হাওর নামে দুটো বড় হাওর আছে।

সন্ধ্যায় সবাই বাড়ি ফিরে এলাম। যাওয়ার সময় আমার গোমরা মুখে দেখে স্পর্শ যা বুঝার বুঝে গিয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর আর আমার হাত আর আমাকে এক সেকেন্ডের জন্য ও ছাড়েনি।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আমি স্পর্শের হাত ধরে দেখলাম জানলাম।

আসার পথে স্পর্শ এর সাথে আমি বসে ছিলাম। জারা দূর থেকে মুখটা কঠিন ভাব করে রেখেছিল। গাড়িতে সবার অগোচরে স্পর্শ আমার গালে চুমু দিয়েছিল। ভুলবশত সেটা জারার নজরে পড়ে যায়। এজন্য আরেকটা চমক আমার জন্য অপেক্ষা করে। শুয়ে শুয়ে সবাই বিশ্রাম নেয় ফিরে এসে।

স্পর্শ কিছুসময় শুয়ে থেকেই কোথায় যেন চলে যায়। আমি রুমে একাই থাকি। এই সুযোগে জারা রুমে আসে আর আমাকে টেনে উঠিয়ে যে গালে স্পর্শ চুমু খেয়ে ছিল সেখানে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়।
আমি চোখ দুটো বড় বড় করে জারার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চড় মারার কারণটা অজানা আমার কাছে।

জারার ফর্সা মুখ লাল টকটকে হয়েছে রাগে। আমার ও রাগ মাথায় উঠে গেছে।আমি কি করব কি করব ভেবে না পেয়ে ঠাস করে একটা চড় মেরে দেয় জারার গালে।

আমার হাতে চড় খেয়ে জারা চিৎকার করে ওঠে, ‘ তোমার তো সাহস কম না। তুমি আমার বাসায় এসে আমাকেই থাপ্পর মারলে।’

‘ হ্যাঁ মারলাম। কিন্তু তোমার ও ত সাহস কম না তুমি বাড়ির আত্মীয় কে থাপ্পড় মারো। তোমার মত বেয়াদব তো আমি দুটো দেখিনা।’

‘তোমাকে মেরেছি বেশ করেছি! আবার মারবো।’

বলে জারা ওর হাত উঁচু করল মারার জন্য আমি ওর হাত মুচরে ধরলাম।

‘তোমার সমস্যা কি মারামারি করতে এসেছ কেন?’

‘স্পর্শ ভাইয়া তোমাকে তখন চুমু খেলো কেন?’

‘হোয়াট এই কারণে তুমি আমাকে মারতে এসেছ?’

‘হ্যাঁ ভাইয়া তোমাকে স্পর্শ করবে কেন? আমি ভাইয়াকে ভালোবাসি সে শুধু আমাকে স্পর্শ করবে। আদর করবে ভালোবাসবে।’

‘বোন হিসেবে তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসে। তুমি তোমার পাগলামো বন্ধ না করলে তোমার এই আজেবাজে পাগলামো কথা কিন্তু আমি স্পর্শ বলে দেব তখন স্পর্শ তোমার মুখের দিকে ফিরে তাকাবেনা। আর আমি তার ওয়াইফ। তিনি আমাকে আদর করবে, ভালোবাসবেই সেটা নিয়ে যদি তুমি জেলাস ফিল হ‌ও আমার তাহলে কিছু করার নেই সরি।’

জারা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি আর ঘুমাতে পারলাম না। ঘুম চোখে আর আসলো না। গালে হাত দিয়ে বসে রইলাম। স্পর্শ রুমে এসো আমাকে এভাবে বসে থাকলে দেখে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,

‘কি হয়েছে? মন খারাপ?’

আমি মাথা নেড়ে না বললাম। স্পর্শ চোখে সরাসরি আমার গালে থাপ্পড় এর দাগ পরলো। উত্তেজিত হয়ে আমার পাশে বসে গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘তোমার গালে কি হয়েছে?’

আমি গাল লুকানোর চেষ্টা করে বললাম, ‘ কিছু হয়নি তো।’

‘ মিথ্যা বলছো? দেখতে মনে হচ্ছে কেউ যেন আঘাত করেছে। পাঁচ আঙুল স্পষ্ট ফুটে আছে!’

‘না মানে আসলে…!

‘ কে এসেছিল রুমে? আর এই কাজ কে করেছে?’

‘কেউ করেনি। এই কাত হয়ে ঘুমাচ্ছিলাম তো তাই এই এরকম হয়ে গেছে।’

‘তোমার কি আমাকে পাগল মনে হয়! যা বুঝাবে আমি তাই বুঝবো!’

‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন!’

‘ওকে না বললে। আমিই খুঁজবো কে আমার বউকে এমন টর্চার করেছে।’

স্পর্শ দু হাত আমার দু হাত রেখে কথাটা বলল। তারপর দুজনের কপাল এক করে চুপ করে রইলো।

আমি ও চুপ করে আছি। স্পর্শের চোখ বন্ধ আমি তাকিয়ে তার উঁচু নাকের দিকে চেয়ে আছি। স্পর্শের ঘনঘন নিশ্বাস আমার চোখে মুখে বারি খাচ্ছে। আমি পলক ফেলছি শুধু। পাক্কা পাঁচ মিনিট পর স্পর্শ চোখ খুলে তাকালো। আমি তো তাকিয়ে ছিলাম। দুজনে চোখাচোখি হয়ে গেল। আমি ফট করেই হেসে উঠলাম। এত কাছ থেকে স্পর্শকে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। আমি নিজের হাসি আটকাতে পারলাম না। আর আমার হাসি যথেষ্ট স্পর্শ রোমান্টিক মুড নষ্ট করার জন্য। আমার এমন পাগলের মতো হাসি দেখে স্পর্শ আমাকে ছেড়ে দূরে সরে ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘হুট করেই এতো হাসির কি হলো?’

আমি হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছি। আর স্পর্শ কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে আমার দিকে বিরক্তকর চাহনী দিয়ে তাকিয়ে আছে।

আমি অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে উঠে বসলাম। স্পর্শ আমার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে গটগট করে চলে গেল রুমে থেকে। যাওয়ার আগে বলে গেল,

‘ আমার এতো সুন্দর রোমান্টিক মুডটাই নষ্ট করে দিলা। আমার আর রোমান্স করা হবে না।’

#চলবে….

Digiqole Ad

Related post

Leave a Reply

Your email address will not be published.