চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_২০

 চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️ পর্ব_২০

চড়ুইপাখির_অভিমান🕊️
পর্ব_২০
#লেখনীতে_নন্দিনী_নীলা

স্পর্শ আমাদের ম্যাথ ক্লাস নেয়। কিন্তু আজকে স্পর্শের বদলে অন্য একজন আসলো। আমি শুধু স্পর্শের ক্লাসে আসার ওয়েট করছিলাম কিন্তু স্পর্শের বদলে আমাদের শাহরুখ স্যার কে আসতে দেখে আমার সমস্ত আশায় জল পড়ে গেল। আমি ঘাড় এলিয়ে দিলাম নিঝুম এর কাঁধে আর বললাম,

‘ দেখছিস উনি ক্লাসেও আসলো না ওই মেয়েটার সাথেই চিপকে আছে। আমার না হয় সংসার বুঝি হওয়ার আগেই ভেঙে গেল রে।’

আমার কথা শুনে মিষ্টি আর নিঝুম খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। আমি দুঃখি মুখ করে বসে আছি।
আমরা তিনজন নিজেদের আড্ডা দেওয়ায় এতোই মশগুল ছিলাম যে ক্লাসে স্যার আছে সেটা ভুলে গিয়েছি। আমরা স্যারকে ভুলে গেলেও স্যার আমাদের খেয়াল করতে বলেনি। তাইতো আমার দুঃখ প্রকাশ করার আগেই স্যারের ককর্শ আওয়াজ শুনে তিনজনকেই দাড়িয়ে পড়তে হলো।

‘ এই মেয়েরা তোমরা কি কথা বলছ? এতো কথা কিসের?’

আমরা তিনজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। মিষ্টি আমার বাহুতে খোঁচা মেরে বলে,

‘ শয়তানি মাইয়া তোর জন্য এখন আমাদের না ক্লাস থেকে বের করে দেয়।’

‘ আমার এতো বড় সর্বনাশ হচ্ছে সেসব নিয়ে তোর চিন্তা নাই। তুই চিন্তা করছিস বের করে দেওয়া নিয়ে। ‘

‘ তোর কিছু হচ্ছে না। স্পর্শ স্যার এত খারাপ না সে তোকে যথেষ্ঠ ভালোবাসে তুই বিশ্বাস করছিস না কেন? ওই মেয়েটা তার পরিচিত কেউ হতে পারে হয়ত কলেজ ঘুরে দেখতে এসেছে।’

‘ হতেই পারে কিন্তু তিনি তো আমাকে এসব বিষয়ে কিছু জানালেন না।’

‘হয়তো তিনি ও কিছু জানতো না মেয়েটা এসে তাকে সারপ্রাইজ দিয়েছে।’

‘ওই মাইয়াটা কেন তাকে সারপ্রাইজ?’

‘তুই আসলেই একটা…

‘তোমরা আবার নিজেদের মধ্য গুজুরগুজুর করে যাচ্ছ দাঁড়িয়ে থেকেও! খুব বেয়াদব তো তোমরা তিনজন যাও বেরিয়ে যাও ক্লাস রুম থেকে। আমার ক্লাস চলাকালীন আর ক্লাসে আসবেনা।’রাগান্বিত স্বরে চিৎকার করে বলল স্যার।

আমরা তিনজনই ভয়ে চুপ মেরে গেলাম। নিচু স্বরে সরি স্যার বলতে লাগলাম। কিন্তু স্যারের মন নরম হলো না। তিনি খুব রেগে আছেন। তার এই ভয়ঙ্কর রাগ দেখে তিনজনেই সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেলাম ক্লাস রুম থেকে।

তিনজনে ক্লাসের বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। ক্লাস গুল্লায় যাক।
আমিতো ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্পর্শকের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। ওই মেয়েটার সাথে যাচ্ছে!
কোথায় যাচ্ছে?আমার কাছে তো ফোনও নাই এখন একটা ফোন থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারতাম। মাঠে তিনজন গালে হাত দিয়ে বসে রইলাম তারপর স্যার ক্লাস থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত বাইরে বসে রইলাম। স্যার চলে যাওয়ার পর ক্লাসে গেলাম। আজকে আর স্পর্শ কলেজে আসলো না। মলিন মুখে আমার ক্লাস সম্পুর্ন করতে হলো।

সারা রাস্তা আসতে আসতে ভেবেছি বাসায় এসেই স্পর্শ কে কল করবো। কিন্তু বাড়ি এসে আর কল করতে পারলাম না। আমার ফোনে ব্যালেন্স নাই। আম্মুর ফোন দিয়ে ও দিতে পারছি না। লজ্জার একটা ব্যাপার আছে না।

রাতে স্পর্শ নিজেই আমাকে কল করলো।
আমি ফোন ধরতে যাওয়ার ফোন অফ হয়ে গেল। স্পর্শ কে কল করতে না পেরে খালি ফোন চালিয়েছি চার্জ কোথা দিয়ে শেষ হয়ে গেছে খেয়াল ই করিনি। মেজাজ টাই খারাপ হয়ে গেল‌। চার্জ বসিয়ে ফোন অপেন করলাম। কিন্তু স্পর্শের কল আসা বন্ধ হয়ে গেছে।রাতটা আমার যন্ত্রণায় ছটফট করে কাটাতে হলো স্পর্শের সাথে কথা বলা হলো না, রাগ দেখানো হলো না, অভিমান করা হলো না, অভিযোগ করা হলো না। এই এত এত মন খারাপ নিয়ে আমি ঘুমাতে ও পারলাম না। কিভাবে যে রাত পার করলাম শুধু আমি জানি।
পরদিন,
সকালবেলা আমার জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছিল। আমি ঘুম থেকে উঠে চমকটা দেখতে পাই। স্পর্শ আমার পড়ার টেবিলে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে পায়ের উপর পা তুলে। আমি চোখ বড়বড় করে স্পর্শর দিকে হা করে তাকিয়ে আছি ঘুম ঘুম চোখে।
তারপর ফট করে বিছানার উপর উঠে বসলাম আর চোখ কচলে কচলে দেখতে লাগলাম সত্যি স্পর্শ বসে আছে নাকি আমি ভুল দেখছি ঘুমের ঘোরে।

স্পর্শের আওয়াজ শুনতেই আমার ঘুমের রেশ কেটে গেল।

স্পর্শ গম্ভীর গলায় বলল, ‘ পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে আসো। এতো বেলা অব্দি কেউ ঘুমায়? লেখাপড়া, কলেজ কোন কিছুর চিন্তায় তো তোমার নাই দেখছি।’

আমি তারাতাড়ি ওরনা খুঁজে গায়ে জরিয়ে বিছানায় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পরলাম। আর তোতলানো গলায় বলতে লাগলাম,

‘ আ–প–নি? এখানে আসলেন কখন?’

স্পর্শ বলল, ‘ কলেজের আর আধা ঘন্টা সময় আছে। তাই তোমার প্রশ্নসব জমিয়ে রাখ। পরে উত্তর দেবো। আগে ফ্রেশ হয়ে এসে রেডি হও!’

‘ কিন্তু আপনি….

‘ কথা নয়। যাও!’

স্পর্শের মুখের উপর আর আমি কথা বলতে পারলাম না। স্পর্শের সামনে থেকে সরে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে কলেজ ড্রেস পরে রেডি হয়ে এলাম। স্পর্শের সামনে মুখে চোখে কিছু দিতেও পারলাম না। কোন রকম স্কাপ বেঁধে বললাম,

‘ চলুন। আমি রেডি!’

ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্পর্শের সামনে এসে দাড়িয়ে বললাম।

স্পর্শ উঠে বলল, ‘ না খেয়েই যাবে?’

আমি অভিমানী গলাতে বললাম, ‘ হ্যা আমার খিদে নেই।’

আমার কথা শুনে স্পর্শ আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘ মেয়েরা এতো ছিদ কাঁদুনি হতে পারে। একটুতেই কান্না এনে ঠেকায়।’

‘ আমি কাদলাম কোথায়?’ অবাক গলায় বললাম।

‘ সামনে কাঁদো নি কিন্তু মনে মনে কেঁদে ভাসাচ্ছো।’

‘ কখনোই না।’

স্পর্শ আমার গালে নিজের এক হাত ডুবিয়ে দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,

‘ তাই?’

আমি চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলাম। স্পর্শের চোখের দিকে তাকাতে পারবো না। তাহলে আমার চোখের জল দেখে ফেলবে।

স্পর্শ আমার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে আরেক হাত দিকে নিজের দিকে টেনে নিলো। মুখ ঘুরানোর সুযোগ রাখলো না। আমি চোখ নিচের দিকে নামিয়ে রেখেছি। স্পর্শ আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

‘ আমার চোখের দিকে তাকাও।’

আমি বললাম, ‘ নাহ। ছারুন। কলেজের লেট হয়ে যাচ্ছে।’

‘এতো অভিমানী কেন তুমি? আমার জীবন তো তোমার অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতেই শেষ হয়ে যাবে।’

‘ ফালতু কথা কেন বলছেন? ছাড়ুন।’

‘ আবার অভিমান করেছো কেন? কাল ফোন ও ধরলে না আবার অফ করে রাখলে! সমস্যা কি?’

‘ দুইবার কল করেই তো কল করা অফ করে দিয়েছেন।’

‘ পাগল তুমি আমি সারা রাত তোমায় কল করেছি কিন্তু নাম্বার অফ ছিল। মেজাজ টা এতো খারাপ হয়েছিল মনে চাইছিল তখনি এখানে এসে পরি।’

‘ আমি নাম্বার অফ করিনি। আটটায় একবার কল দিয়েছিলেন। তখন আমার ফোনে চার্জ না থাকায় অফ হয়ে যায়। আমি চার্জ বসিয়ে আপনার কলের অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু আপনি আর কল করেন নি। তারপর ফোন হাতে রেখেই ঘুমিয়ে পরেছি। কল আর আসেনি ওয়েট দেখাচ্ছি। ‘

আমি বিছানায় থেকে ফোন এনে দেখাতে গিয়ে দেখি ফোন সত্যি অফ। স্পর্শ রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ঢোক গিলে স্পর্শের দিকে তাকালাম।

‘কি হলো?’

‘ আমি সত্যি ইচ্ছে করে এটা করিনি। কীভাবে অফ হয়ে গেল? আমি নিজেই জানি না।’

‘ ওকে।’

স্পর্শ আমার থেকে সরে এসে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো।
আম্মু খাবার বেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জন্য। আমার দিকে স্পর্শ তাকিয়ে বলল,

‘ কিছু খাবে নাকি চলে যাবে?’

‘খাবো। আপনিও তো খাননি মনে হয়।’

‘ আমার চিন্তা করতে হবে না। তোমার কি ইচ্ছে তাই বলো।’

‘ খাব।’

আমি রাগ আর খাওয়ার উপর দেখাতে পারলাম না। কারণ আমি জানি আমি না খেলে স্পর্শ ও খাবে না। আর আম্মু যদি জানে আমার জন্য স্পর্শ না খেয়ে চলে যাবে তাহলে আমায় যে কি করবে তিনিই জানে।

কলেজ আসার পাঁচ মিনিট আগেই আমাকে নামিয়ে দিল গাড়ি থেকে তারপর বাকি রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে বলে গাড়ি নিয়ে চলে গেল স্পর্শ।

আমি দাঁত কিড়মিড় করে গাড়ির দিকে তাকিয়ে র‌ইলাম। গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই আমি রাস্তাতেই লাথি মেরে হাঁটতে লাগলাম।

#চলবে……

Digiqole Ad

Related post

Leave a Reply

Your email address will not be published.