জুনুন (Crazy Lover) #পর্ব_০৪

0
299

#জুনুন (Crazy Lover)
#পর্ব_০৪
#শারমিন_আক্তার_বর্ষা
_______
আগামীকাল কলেজে নবীন বরণ অনুষ্ঠান। কলেজে কাল সকলে শাড়ি পরে যাবে, আর্শিকে তার কিছু ক্লাসমেট রিকুয়েষ্ট করে জেনো শাড়ি পরে আসে। এদিকে রুমে বসে বসে ভাবছে কাল কলেজেই যাবে না। কত কষ্টে তাদের দিন পার করতে হয়। নিজের একলা কামাই তাও টিউশনির জন্য দিন চলে যায়। এর মধ্যে নতুন শাড়ি কোথায় পাবে। তার জানা মতে তার মা’র শুধু চারটা শাড়ি আর সেগুলো তিনি নিজেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিধান করেন। আর নিজের তো উঠানো তেমন জামা কাপড়ও নেই, উঠানো বলতো গত বছর ঈদে যখন তার মা চাকরি করতো তখন একটা থ্রি-পিস এনে দিয়েছিল, তাও সেটা কলেজে পরে যাওয়া যাবে না। কারণ আগেই বলে দিয়েছে শাড়ি পরে যেতে হবে। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলেন আয়েশা বেগম (আর্শির মা’র নাম) বাথরুম থেকে রুমে, মেয়েকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে রুমের মধ্যে প্রবেশ করেন। বিছানায় আর্শির পাশে বসে, কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে, ‘ কি হয়েছে মা তোর, তোকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেনো? ‘

আর্শি হতাশ হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘ কিছু হয়নি মা, তুমি এখনও ঘুমাওনি কেনো? শরীর ঠিক আছে তোমার?

আয়েশা বেগম মেয়ের হাতের উপর হাত রেখে বললেন, ‘ আমার কিছুই হয়নি রে মা। বাথরুম থেকে রুমে যাচ্ছিলাম তখন তোকে জেগে থাকতে দেখি সাথে তোকে খুব চিন্তিত লাগছিল। মা’কে বল কি হয়েছে তোর? ‘

আর্শি মাটির দিকে তাকিয়ে এক হতাশাজনক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের উদ্দেশ্য বলে, ‘ জানো মা, কাল আমাদের কলেজে নবীন বরণ উত্সব অনুষ্ঠিত হবে। আর সকলে শাড়ি পরে যাবে আমাকে আমার ক্লাসমেট মানে আমার সাথে একই ক্লাসে যারা পড়ে তারা অনুরোধ করে যাতে আমিও কাল শাড়ি পরে যাই। কিন্তু আমার তো কোনো শাড়িই নেই সেজন্যই মন খারাপ, ভেবেছি কাল কলেজেই যাবো না। ‘

বলে দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুজে দেয়। আয়েশা বেগম আর্শির খোলা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘ এই জন্য তোর মন খারাপ আয় মার সাথে। ‘

আর্শি বিষ্ময়কর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, ‘ কোথায়? ‘

‘ এত প্রশ্ন কেনো করছিস আসতে বলছি আয় ‘

আর্শি পাল্টা আর কোনো প্রশ্ন করল না। মায়ের হাত ধরে সাথে চলতে লাগল, রুমের মধ্যে এসে খাটের নিচ থেকে একটা ট্রাং বের করলেন আয়েশা বেগম। ট্রাং টা ধরে বিছানার উপর রাখল। রুমের এক কোণায় লুকিয়ে রেখেছে তালার চাবি। আর্শি এই ট্রাং আগে দেখেনি তাই গিয়ে পাশে বসল। চাবি এনে তালা খুললেন। ভেতরে শুধু আর্শি ও তার ছোট ভাই আশরাফের ছোট বেলার খেলনা ও জামা কাপড়, আর্শি বিস্মিত স্বরে বলল, ‘ মা তুমি আমাদের ছোটবেলার সব কিছু এত যত্ন করে রেখে দিছো আর আগে কেনো বলোনি৷ ‘

আয়েশা বেগম ঠোঁটের কোণে মৃদু হেঁসে বললেন, ‘ আমার ছেলে মেয়ের জিনিস কি আমি ফেলে দিতে পারি? হোক না সেটা অনেক বছর আগের অথবা তাদের ছোটবেলার। ‘

আর্শির মন মুহুর্তেই ভালো হয়ে যায়। খেলনা ও কাপড়গুলোর উপর হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে, তখন আয়েশা বেগম ট্রাং এর একেবারে নিচের থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো কিছু একটা বের করল, আর্শি ভ্রু কুঞ্চিত করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, ‘ এটা কি মা আর এটা প্যাকিং করে কেনো রেখেছো? ‘

আয়েশা বেগম মেয়ের কথার কোনো প্রত্যত্তর করলেন না। শুধু কাগজ টা ছিড়ে মাটিতে ফেলে দিলেন। আর্শি জেনো খুশিতে পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তবে সে, খানিকের জন্য খুশি দাবিয়ে নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘ তুমি এটা কোথায় পেলে মা? ‘

প্রশ্ন টা শুনতেই আয়েশা বেগমের চোখ ভাড়ি হয়ে আসে। শাড়ির আঁচল টেনে চোখের অশ্রু মুছে বলল, ‘ এটা আমাকে তোর বাবা দিয়েছিল যখন আশরাফের সাত মাসের সাধের অনুষ্ঠান হয়েছিল তখন উপহার দিয়েছিল। আমি তার দেওয়া প্রথম ও শেষ উপহার টা কে খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে এটাকে বাহির করার সঠিক সময় এসেছে৷ তুই পড়বি শাড়িটা আর কাল কলেজেও যাবি। এখন বল মায়ের শাড়িটা তোর পছন্দ? ‘

আর্শি শাড়িটা হাতে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে। বিছানার উপর বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লাফাতে লাফাতে বলল, ‘ ও মা পছন্দ হ’য়েছে মানে খুব হয়েছে। আমিও কাল কলেজে শাড়ি পরে যাবো৷ উফফ মা জানো আমার তো খুশিতে পাগল পাগল লাগছে। ‘

‘ হয়েছে আর লাফাতে হবে না। পরে দেখবি পা পিছলে মাটিতে পরে যাবি৷ এখন মায়ের সামনে এসে বস, চুলের জট গুলো ছাড়িয়ে বেনি পাকিয়ে দেই। ‘

দূর থেকে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে বলে উঠল, ‘ আমি চুলে তেল দেবো না। ‘

‘ তোকে কি এত রাতে মাথায় তেল দিয়ে দেবো নাকি? চুলের কি অবস্থা আয় আমি আঁচড়ে দেই। ‘

সে খুব ভালো করেই তার মাকে চিনে তো সে এটাও জানে তার মা কখন কি বলে আর কি জন্য বলে। একটা চিরুনি হাতে নিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসলো। আয়েশা বেগম খাটের উপর বসেছে আর আর্শি একটা টোলে বসেছে। চুলে চিরুনি করতে করতে আয়েশা বেগম বললেন, ‘ চুলগুলো কেমন উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে একটু তেল দিয়ে দেই? ‘

আর্শি উত্তেজিত হয়ে যায় হুট করে পেছনে ঘুরে বলে, ‘ দেখছো মা আমি তখনই বলছিলাম চুলে তেল দিবো না। তুমি ছাড়ো আমি একাই আঁচড়ে নেবো। ‘

‘ এমন করিস কেন? চুপ করো বোস তেল দিলে দিবি না দিলো না দিবি আমি তো তোর ভালোর জন্যই বলছিলাম। যা রোদ পরেছে এত গরমে কোথাও যদি মাথা ঘুরে পরে যাস তখন ধরবে কে তোকে? তাইতো বললাম তেল দিলো মাথা ঠান্ডা থাকবে। ‘

‘ হইছে মা আমি বুঝছি, তোমার আর আঁচড়াতে হবে না ছাড়ো আমার চুল। ‘

আয়েশা বেগম আর কিছু না বলে মুখে ভেংচি কেটে আর্শির চুলের মুঠি ধরে একটু জোরেই হিচকা টান মারেন। তাতে অস্ফুটস্বরে আর্শির মুখ থেকে ‘ আহহ’ শব্দটি বের হয়।

পরেরদিন সকালে,
দ ভাঙ্গে আর্শির হাস মুরগীর ডাকাডাকি তে, ঘুম থেকে উঠে এক হাত মুখের উপর রেখে হাই তুলে খাটের উপর থেকে নামে, পাশ থেকে ওড়না গলায় জড়িয়ে নিয়ে রুম থেকে বের হয়।

সকালের ঘর ঝাড়ি দেওয়া থেকে শুরু করে টুকটাক সব কাজ আর্শি গুছিয়ে নেয়। নাস্তা কমপ্লিট করে কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, দুইচোখের কার্ণিশে গাঢ় করে কাজল দেয়। আর্শির সাজগোজে তেমন ইন্টেরেস্ট নেই, তবে তার চোখে গাঢ় করে চোখে কাজল পরতে ভালোলাগে। এটা তার একটা শখ বলা যেতে পারে।

মানুষ যা ভাবে সব সময় সেটা হয় না। মাঝেমধ্যে হিতে বিপরীত হয়ে যায়। ঠিক এমনই হয়েছে কলেজে আর্শির সাথে, ওর সাথে এমনটা হবে কল্পনাও হয়তো করেনি।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here