ভালোবাসাটা_আমার,২৫,২৬,২৭

0
622

#ভালোবাসাটা_আমার,২৫,২৬,২৭
#রোকসানা_আক্তার
পর্ব-২৫

তার সাতমিনিটের মাথায় নিতুর ভাই ফারুক বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলো।রিহান ভাবলো এবার কিছুটা হলেও উনাকে সংযত করা যাবে।রিহান নিতুকে রেখে ফারুকের দিকে শ্লথ পায়ে এগিয়ে গেলো।সালাম করলো।ফারুক রিহানের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না।রিহান কিছু বলতে মুখ খুলবে তার আগেই নিতুর ভাই রিহানকে পাশ কেঁটে ধড়মড় চলে গেলো।রিহান পেছন থেকে বলে উঠলো আবার,

“ভাইয়া যাবেন না দয়া করে।আপনার সাথে আমার কথা ছিল..!”

ফারুক এতক্ষণে তার ঘরের ভেতর ঢুকে গেছে।দরজা বন্ধ করবে তার আগমুহূর্তে একফোঁড় রিহানের দিকে তাঁকিয়ে,

“আমি কিছু শুনতে ইচ্ছুক নই।যা বলার মা-বাবাকে বলুন।আমি এসব ব্যাপারে জানি না।”

বলে রিহান এবং নিতুর সামনে ফারুক শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো!রিহান এবং নিতু বুঝলো ভাই তাদের বিশ্বাস করলো না!সেও মুখ ফিরিয়ে নিল সবার মতন।নিতুর চোখ ভিঁজে আসলো আবার।ভেঁজা চোখে রিহানের বুকের উপর বলতো মাথাটা রেখে নিজের তাল সামলানোর চেষ্টা করলো।রিহান নিতুর পিঠে হাত রাখলো।বললো,

“কিছু হবে না নিতু।সব ঠিক হয়ে যাবে।সব ঠিক হয়ে যাবে…!”

নিতু রিহানের বুক থেকে মাথা তুললো।চোখের পানি মুছলো।রিহানকে কিছু না বলে পেছনের দিকে ফিরে ঘরের দিকে পা চালালো।রিহান অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো কোথায় যাচ্ছে নিতু!নিতু দরজার কাছে এসে ছোট্টবোনকে ডেকে উঠলো,

“মিতা?”

মিতা সাথে সাথে জবাব তুললো।নিতু বললো,

“দরজাটা খুলবি,বোন?”

মিতা বোধহয় দরজা খুলতে এগুলো।কিন্তু পারলো না।নিতুর মা বাঁধা দিলো।নিতু শুনলো।বলে উঠলো,

“মা আমি বাবার সাথে কথা বলবো!দয়া করো দরজাটা খুলো মা।”
“দরজা খুলতে পারবো না।যেই ছেলের সাথে এসেছিস।ওর সাথে ফিরে যা।আমরা তোর কেউ না এখন আর!”

নিতু নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে আবার বলে উঠলো,
“আমি তোমার সব কথা মানবো।একটু বাবার সাথে কথা বলবো।দয়া করো দরজাটা খুলো মা।এমন করো না।”
“আমার মাথা গরম করিস না!যেখান থেকে এসেছিস আবারো বলছি সেখানে ফিরে যা!!

কথাটা নিতুর মা একটু চেঁচিয়েই বলে উঠলেন,যা লুৎফরের রুমে বিয়ে পৌঁছায়।লুৎফর তার রুম থেকে বেরিয়ে আসে।বলে,

” কি হয়েছে?”

নিতুর মা লুৎফরের কথার জবাব না দিয়ে নিজের ঘরে চলে যান।লুৎফর এবার দরজার দিকে তাকায়।নিতুর গলার ধ্বনি আসছে।লুৎফর এগিয়ে গেলো না আর সেদিকে।নিজের ঘরে আবার ফিরে আসে!

নিতুর দরজা নিয়ে এই যে খুটুর-খাটুর দূরে দাঁড়িয়ে রিহান সবটা দেখে।খুব কষ্ট লাগতেছে আজ কেনজানি তার।নিতু কাঁদছে।কিছুটা আওয়াজ করে কাঁদছে।রিহান দ্রুতপায়ে নিতুর কাছে আসে।দুইকাঁধে হাত রেখে,

“কাঁদে না নিতু!কাঁদে না!”
“আমি মা-বাবার খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি!আমাকে কেউ আর কখনোই ক্ষমা করবে না!”

বলতে বলতে নিতু আবার কেঁদে উঠে।রিহানের কিছু বলার ভাষা রইলো না।মুখটা কেনজানি শান্ত হয়ে গেলো।নিতুকে কোন শব্দগুলো দিয়ে সামলাবে, নিরব করাবে তা জানে না রিহান।

———————————
“ওহ তাহলে এই পোলার লগেই পালাইলি?”

একটা কুৎসিত গলার স্বরে রিহান এবং নিতু উভয়ই চমকে উঠে।পাশ ফিরে তাকিয়ে একজন আঁধবয়সী মহিলা।মুখে পানের খিল।ঠোঁটজোড়ার ফাঁকে কয়েকটা দাঁত দেখা যায়, তা টকটকে লাল।নিতু মহিলাটিকে চিনতে পারলো ভালো করে।তাদের বাড়ির পুকুরের ওপাড়ে উনাদের বাড়ি।স্বভাবে ভালো না খুব একটা।মহিলাটি আবার বলে উঠে,

“ঢাকাইয়া পোলার কান্দে ঝুঁলিয়া গেলি?তয় কয়রাত আছিস একসাথে?”

রিহানের বেশ উদ্ভট লাগলো এই মহিলার কথাবার্তা গুলো।সাথে চরমমাত্রায় রাগ চলে এলো!নিতুকে বললো,

“নিতু?এখানে আর একটা মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না!চলো।”

বলে নিতুর হাত টান মেরে নিতুকে এদিকপ নিয়ে এলো।এবং পথের দিকে হাঁটা ধরলো।পেছন থেকে,

“আরেহহ কই যাস তোরা?কই যাস?মানুষজন দেখবো না তোদের?মানুষজনরে আগে দেখাইয়া নিই তোদের,তারপর যাইস।”

রিহান নিতুকে গাড়িতে বসিয়ে দিলো।রিহান ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।নিতু বলে উঠলো,

“আমরা কোথায় যাচ্ছি? ”

রিহানের কোনো জবাব এলো না!

————————————
বাইরে থেকে আর কোনো আওয়াজ কানে এলে না নিতুর।লুৎফর বসা থেকে উঠে এলেন।জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।উঠান খালি।চারপাশে আঁধার নেমে আসছে।ওরা বোধহয় চলে গিয়েছে লুৎফর বুঝলো।আবার নিজের ঘরে অন্ধকারমাখা ঘরটায় ফিরে এলো লুৎফর।সামনে থাকা চেয়ারটায় বসে পড়লো।চোখ বুজলো।চোখের সামনে ভেসে উঠলো মেয়েকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলোর ছবি।অনেক বড় আশা নিয়ে মেয়েকে ঢাকায় দিয়েছেন। কিন্তু আজ..!

———————————-
রিহান ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে নিতু খাটের উপর এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে।
গ্রাম থেকে ফিরেছে মিমিট ত্রিশেক হবে।এখন গভীর রাত।দীর্ঘ জার্নি ছিল।এই পুরো জার্নিতে মেয়েটা গাড়িতে কেঁদে এসেছে।ক্লান্ত খুব এখন হয়তো।তাই রুমে ঢুকামাত্রই ঘুমিয়ে গেছে।ফ্রেশও হওয়া হয়নি মেয়েটির।রিহান নিতুর কাছে যেয়ে পাশ থেকে বালিশ টেনে নিতুর মাথার নিচে গুঁজে দিলো।কপাল,গালে মাথার কিছু চুল এলোমেলো হয়ে আছে,সেগুলো রিহান কানের দুই পাশে গুঁজে দিলো।নাভির উপর থেকে সরে যাওয়া কাপড়টা ঠিক করে দিলো।তারপর বাতি বন্ধ করে নিজে সোফায় শুয়ে পড়লো।খাটে শুতো।কিন্তু নিতু এলোমেলো হয়ে শোয়ার কারণে তার শোয়ার সিস্টেম ছিল না।

চলবে….

#ভালোবাসাটা _আমার
#রোকসানা_আক্তার
পর্ব-২৬

নিতু চুপচাপ বসে আছে।দৃষ্টি জানলার বরাবর বাইরের উঁচু উঁচু দালানগুলোর দিকে।রিহান ভেতরে ঢুকে।হাতের ফোনটা টেবিলের উপর রেখে বলে,

“দুপুরের খাবার খেয়েছো,নিতু?”

নিতু চমকে উঠে।তাকিয়ে রিহান।অফিস থেকে এত তাড়াতাড়ি ফিরলো?মনের প্রশ্ন মনেই ছিল।মুখ খুলে আর নিজে কিছু বলতে গেলো না।মাথা নাড়লো শুধু।মানে খেয়েছে।

“স্নেহা কলেজ থেকে ফিরেছে?”

তাতেও মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।নিতু এখানে আসার পর থেকে এভাবে ইঙ্গিতেই কথা বলে।
প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলে না।পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তা নিয়ে নিতুর মন খুব ক্ষুদ্র হয়ে গেছে।আর এই ক্ষুদ্র মনের একমাত্র কারণ তো রিহান নিজেই।এসব কিছু হওয়ার পেছনে রিহান নিজেই নিজেকে দায়ী করে এখন।রিহান আবার উদাসীন হয়ে যায়।ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে।

————————————————
রিহান দুপুরের খাওয়া শেষ করে টিস্যু হাতে মুখ মুছে।এমন সময় দরজায় কলিংবেল বাঁজে।স্নেহা পাশে ছিল।বললো, “স্নেহা দেখ তো ক এসেছে?”

স্নেহা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।সিয়াম ভাইয়া এসেছ।সে রিহানের স্কুলজীবনের বন্ধু।মাঝেমধ্যে প্রায়ই আসে।তবে ভাইয়া বিয়ে করার পর থেকে আর তেমন উনার দেখা পায়নি। সিয়ামকে দেখে রিহান হেসে উঠে।সিয়াম রিহানের কাছে এসে গলা নেয় কিছুক্ষণ।তারপর বলে,

“লুকিয়ে লুকিয়ে ত বিয়ে করে ফেললি ব্যাটাা।আমাদের একবারও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলি না।বাহহহহ..।তা ভাবী কোথায়?”

রিহান আবারো হাসে সিয়ামের কথা শুনে।বলে,
“ওদিকে চল।ওখানে বসো কথা বলি।”
“চল।”

রিহান এবং সিয়াম হলরুমের সোফায় যেয়ে বসে।
দীর্ঘ আলাপণ পর সিয়াম কথার মাঝে হঠাৎ বলে উঠে,

“তা বেবীটেবী নিবি না?একটা বেবী নিয়া নে।একটু মামাটামা হমু।”

রিহান চুপ করে আছে।সিয়াম লক্ষ করছে কথার মাঝে ও যতবার নিতুর কথা টেনেছে ততবারই রিহানের থেকে নিরবতা উত্তর পেয়েছে।নিতুকে পেয়ে কি রিহান খুশি নয়?প্রেম করেই তো বিয়ে করলো দুইজন।সিয়ামাা এবার নিজের সিট ছেড়ে অপর সিটে গিয়ে বসলো।মানে রিহানের পাশে।কাঁধে হাত রেখে বললো,

“কী ব্যাটা, মন খারাপ? ”

বলে হাসার চেষ্টা করলো রিহান।বললো,
“আরেহ নাহ!”
“অভিনয় করছিস?”
“দূর কিসের অভিনয়!”
“তোর চোখমুখ তাই বলছে।”

“তেমন কিছু না।শুনলি ই তো কতটা এক্সিডেন্টলি বিয়েটা হয়েছে।”
“হ্যাঁ,হয়েছে।ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিস।”
“কিন্তু নিতুর সাথে আমার অনেক দূরত্বতা।ওকে যেহেতু ভালোবাসি খুব ওর পরিবারের সাথে কথা বলে ওকে বিয়ে করা উচিত ছিল।কিন্তু সেভাবেও যে করবো সেই সুযোগটাও ছিল না ওই আবরাহামের জন্যে।”
“বুঝতে পারছি সব।তবে দোষটা তোরও দেওয়া যায়না,বা নিতুর,বা নিতুর পরিবারের!”

রিহান ভ্রু যুগল কুঁচকে ফেলে।বলে,
“কি বলতে চাচ্ছিস?”
“যা হবার তাতো হয়েই গেলো তাই না?এখন আগের সব টেনে নিজেদের দাম্পত্য জীবনে কেনো ঝামেলা করছিস।এই যে নিজের দোষ দিচ্ছিস,সেই অনুশোচনায় নিতুর সাথে ঘেঁষছিস না।একদিন এই সময়টাকে খুব ফিল করবি।খমোখা ওসবকিছুর রেষ ধরে ধরে নিজের ভেতরের চাপা চাওয়া,ইচ্ছাকে কেনো দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস।শুন?যখন যেই পরিস্থিতিতে থাকিস তা উপভোগ করার চেষ্টা করিস।তাহলে বুঝতে পারবি জীবন কতটা সুন্দর।মানুষের জীবনে বাঁধা-বিপত্তি থাকে।দুর্বার ঝামেলা থাকে।তা আবার একদিন ঠিকও হয়ে যায়।তাই বলি কি।ভাবীর মনমরা,চুপচাও এসব হওয়াটা স্বাভাবিক।তুই তোর ভালোবাসা দিয়ে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা কর।তুই ই পারবি তার মনের সব বিষন্নতা মুহুর্তে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সুন্দরভাবে দুইজন জীবন কাটাতে।তারপর আরো অনেক বুঝায় সিয়াম।

—————————————-
রাতের খাবার শেষ হলে নিতু রুমে চলে যায়।তারপর রিহানও।রিহানের চোখমুখের দৃষ্টি ভালো না।সিয়াম যাওয়ার পর থেকেই মনটা ফুর্তিতে ভরা।তাট মনে কি যেনো ঘুরছে নিতুকে নিয়ে সে নিজেই ভালো জানে।নিতু হাতমুখ ধোঁয়ার জন্যে বাথরুমে ঢুকে।দরজা অবশ্যি লক করে নি।শুধুা হাতমুখই তো ধোঁবে আর তো কিছু না তাই আর দরজা লক করার প্রয়োজন বোধ করে নি।রিহান কি করে?তার মিনিট একেক পরই দরজা আলতো ঠেলে সেও বাথরুমে ঢুকে পড়ে।নিতু চমকে উঠে।রিহান হেসে দিয়ে দরজা লক করে ফেলে।নিতুর চমকানো ভাব আরো বেড়ে যায়।রিহান আবারো একফালি হাসে।হেসে এবার আরেকটা কান্ডা ঘটায়।তা হলো ঝর্ণার কল ছেড়ে দেয়।মুহূর্তে নিতুর শরীরের কিছু অংশ ভিঁজে যায়।নিতু এবার চেঁচিয়ে বলে উঠে,

“কি করতেছেন আপনি এসব!”

রিহান হাসি মাখা মুখেই উত্তর করে,

“গোসল করবো।”
“তাহলে আমাকে ভেঁজচ্ছেন কেনো?”
“তুমিও গোসল করবে।”
“পাগল আপনি?এতরাতে আমি গোসল করবো?এমনিতে যেটুকু ভিঁজে গেছি তাতেই অবস্থা খারাপ। ঠান্ডা লাগলে আপনার খবর আছে। ”

রিহান এবার নিতুর ভেঁজ অংশটার দিকে তাকায়।বুকের অংশটা ভিঁজে ছপছপে।ভেতরে ব্লাউজ পড়েছে তাও দেখা যাচ্ছে।নিতুর এবার কেনজানি লজ্জা লেগে যায় খুব।সে নিজেকে আড়াল করতে বুকের উপর হাত রেখপ বলে,

“জায়গা দিন আমাকে।আমি বেরুবো।”

বলে রিহানকে পাঁশ কাটতে চায়।রিহান দরজা বরাবর দাড়িয়েই থাকে।সরে না।নিতুর রাগ উঠে যায়।চোখ বড় করে রিহানের দিকে তাকায়।
“সমস্যা কি আপনার?”

রিহান কিছু বলে না।আস্ত পায়ে নিতুর দিকে এগোয়।নিতু আবারো চেঁচিয়ে,

“এএএ আসবেন না!”

বলেও লাভ নেই।রিহান নিতুর খুবই কাছাকাছি। নিতুর বুকের ভেতরটা ধকধক করছে.মুখে উষ্ণ শ্বাস!রিহানেরও তাই।রিহান বলে,
“ভালোবাসি নিতু!”

নিতুর ঠোঁট কেঁপে উঠে।রিহান সেই ঠোঁটে চম্বন বসিয়ে দেয়।এই প্রথম রিহানের থেকে নিতুর পাওয়া প্রথম স্পর্শ!নিতু রিহানকে সরিয়ে দিতে চেয়েও পারে নি।চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে চোখবুঁজে।রিহান নিতুর গালে,গলায় অনবরত কিস করে যাচ্ছে।ঝর্ণার কল তখন বন্ধ করা হয়নি।নিতু দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল।কিন্তু এখন আর দূরে নয়।ঝর্ণার পানির নিচেই দুইজন পানির সাথে মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে।পূর্ণতা পাচ্ছে তাদের এতদিনের চেপে রাখা গভীর ভালোবাসার!

চলবে…

#ভালোবাসাটা_আমার
#রোকসানা_আক্তার
পর্ব-২৭

নিতুর কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। আগের সেই নিরবতা,নিশ্চুপতা কেঁটেছে।রিহানের সাথে কথা বলার যেই জড়তা টা ছিল এখন তা নেই বললেই চলে।রিহান কোনো রকমের রসিকতার কথা টানলেই “হো হো হো” করে হাসে,যা দেখতে রিহানের খুব ভাল্লাগে।মনে মনে খুব স্বস্তি পায় রিহান।কারণ সে এরকমটাই চেয়েছিল।মোটামুটি সুন্দর ভাবেই সংসারটা এগুচ্ছে তাদের।এতকিছুর মাঝে রিহানের আর একটা ইচ্ছে তা হলো “সে বাবা হবে”। কিন্তু এই কথাটা নিতুকে বলতে পারছে না।বলতে গেলে নিতু লজ্জায় কুঁকড়ে যাবে।ক’দিন ধরে তার সাথে না জানি কথা না বলে কে জানে।এমনিতে মেয়েটির অনেক লজ্জা বেশি।সে’বার প্রথম তারসাথে নিতুর শারিরীক সম্পর্ক হওয়ার পর সে ত কথাই বলতে চায়নি রিহানের সাথে।রিহানের চোখের সামনে পড়লেই লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিত,বা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতো।এরকম চারদিন ধরে করেছে।তবে সেটা রিহান আবার নানান কৌতুক, হাসিরসাত্রক ভরা কথা টেনে জড়তা কাঁটিয়ে দিয়েছে।এখন এটার সময় কতদিন মুখ ঘুরিয়ে নেয় কে জানে!রিহানের ভীষণ হাসি চলে আসে।ভাইয়াকে নিজমনে হাসিটতে তা দূর থেকে স্নেহা পর্যবেক্ষণ করে।ভ্রু’যুগল কুঁচকে কৌতুক কন্ঠে জোরে বলে উঠে ,

” আহা একটু হাসো না!ভাবীর কি মন পেয়েছো নাকি?”

রিহান হঠাৎ বোনের এহেন কথা শোনে থতমত খেয়ে যায়!চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ধমকের স্বরে বলে,
“এখানে কি তোর?যা কলেজে যা!কলেজে যাওয়ার সময় আসে গোয়েন্দাগিরী করতে!”

বলেই রিহান বোনের সামনে থেকে কেঁটে পড়ে।তা দেখে স্নেহা মুখ চেপে হাসে।রিহান রুমে আসে।এসে দেখে নিতুকে খুব উদ্বিগ্নতা লাগছে!কোনো কিছু নিয়ে যেনো খুব চিন্তিত!রিহান কাছে গেলো নিতুর।শান্ত স্বরে বললো,

“কি হয়েছে নিতু?”

নিতু খানিকক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিলো,
“প্রিয়া কল করেছে।আগামী মাসের ৫ তারিখে নাকি আমাদের সপ্তম সেমিস্টার এক্সাম!আমিতো কিছুই পারি না।বইও নাই।বই সব কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে?হলে নাকি বাসায় বুঝতেছি না।”

রিহান শুধায়।বলে,
“আরেহ চিন্তা নেই বোকা মেয়ে!আমি আছি না?আমি সব জোগাড় করে দিব।এখন তুমি শুধুা আমাকে লিস্ট দাও কোন কোন বইগুলো তোমার লাগবে।”

নিতু আমোদিত কন্ঠে বলে উঠে,
“আচ্ছা আমি প্রিয়ার থেকে নিয়ে দিচ্ছি।এক মিনিট।”

বলেই প্রিয়াকে আবার কল মারে।প্রিয়া সব লিস্ট মেসেন্জারে পাঠিয়ে দেয়।নিতু রিহানের মেসেন্জারে।রিহান লিস্টগুলো পেয়ে,

“তাহলে নিয়ে আসতেছি।”

বলেই রিহান রুম থেকে বেরিয়ে যায়।নিতুর তা দেখে ভীষণ ভালো লাগে।রিহানযে তাকে এতটা কেয়ার,তার উপর তার পড়াশুনার প্রতি অনুরাগী। সত্যিই খুব ভালো লাগার মতন।তবে নিতুর একটাই ইচ্ছে এখন,পড়াশুনাটা শেষ হলে ভালো একটা চাকরির জুটিয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে।বাবার খুবই স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে।মেয়েটা একদিন অনেক বড় হবে।গ্রাম-গঞ্জে মেয়েটার সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।অমুকের মেয়ে তমুক হইছে,তমুকের মেয়ে অমুক হইছে।এমন একটা প্রশংসার গর্ববোধ ছিল বাবার মনে। বাবা হয়তো ভেবেছে বিয়েটা হওয়াতে সব শেষ!কিন্তু না বাবার নিতুকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন তা নিতু পূরণ করবেই।বিয়ের ঝামেলা তাকে তার স্বপ্ন থেকে সরাতে পারবে না।নিতু আশাবাদী ভীষণ।কেননা,রিহানও তাকে সাপোর্ট করছে আজকে যতটা বুঝলো।

—————————————–
একমাস গড়াতেই নিতু বুঝতে পারে নিতু প্রেগন্যান্ট!ডাক্তারের থেকে রিপোর্ট নিয়ে আসার পর বাসায় এসে নিতু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়।মনটা কেমন বিক্ষিপ্ত, আর চুপচাপ।নিতুর এহেন কান্ডে রিহান বুঝে উঠতে পারলো না!মেয়েটার মাঝে এরকম ভাবভঙ্গি কেন?এমন একটা খুশির সংবাদে তার যতটা না খুশি থাকার কথা,সে ত ততটাই দুঃখে।রিহান নিজেকে যথাআজ্ঞা সামলিয়ে নিতুর কাছে গিয়ে বসে।মুখের উপর উপচে পড়া এলোমেলো চুলগুলো কানের দু’পাশে গুঁজে দিয়ে বলে,

“নিতু?কি হয়েছে?মন খারাপ তোমার?”

নিতু চুপ করে আছে!রিহান দুয়েক সেকেন্ডস চুপ থেকে আবার বলে,
“আমি কি ভুল কিছু করে ফেলেছি নিতু?বলো আমাকে? ”

নিতুর এতক্ষণে জমিয়ে রাখা রাগ,অভিমান,কষ্ট এবার ধক করে জ্বলে উঠে।তেঁজি কন্ঠে বলে উঠে খুব,
“মা এত তাড়াতাড়ি মা হতে চাই নি!কেনো আমাকে বাধ্য করালেন এত তাড়াতাড়ি মা হতে!?”
“তুমি কি তাতে খুশি নও নিতু?”

নিতু কাঁদে।তিরতির করো চোখের পানি পড়ছে।রিহান বুঝতে পারছে না নিতু এখম মা হওয়াতে কেনো খুশি নয়!অথচ সে ত মনে মনে কতই না ভেবে রাখলো এই সংবাদটা তার এবং নিতুর জন্যে পৃথিবীর সবথেকে খুশির সংবাদ।রিহান মনে মনে নিজেকে আবার ধাতস্থতা করে।গালে হাত রেখে আবার শুধায়,

“নিতু?”

নিতু ঝট করে রিহানের হাত সরিয়ে দেয়।বলে,
“ধরবেন না আমাকে!আপনার জন্যে সব হলো!”
“আমি বুঝতেছি না নিতু আমি কি করে ফেলেছি।দয়া করে যদি বলতে…!”

নিতু এবার রিহানের দিকে তাকায়।ছেলেটার চোখমুখে কোমলতা,নিষ্পাপত্ব, মলীনতার ছাপ দেখে নিতুর তেজি ভাব দমে যায়।মিনিট দুয়েকের মতন চুপ থাকে।রিহানও নিতুর নিরবতার অপেক্ষা কাটিয়ে কথা শুনতে চুপচাপ চেয়ে থাকে।নিতু ছোট্ট করে হাঁক ছেড়ে বলে,

“আমার ইচ্ছে ছিল অনার্সটা শেষ করে,বা চাকরিটা পেয়ে ওই ডিসিশন নিতে।কিন্তু চাকরি তো দূরে থাক,পড়াশুনা শেষ না হওয়ার আগেই আমাার সব শেষ হয়ে গেল!পড়াশুনা তো আর হবে না!আবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদটা কল্পনাার স্বপ্নেই চাপা পড়লো!সংসারটা ধরিয়ে দিয়ে আপনি আমার পরিবার থেকে আমাকে আরো বরদাস্ত করলেন!কেন এরকম হলো?আমি কি আর কখনোই পরিবারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবো না!?বাবাকে গিয়ে বলতে পারবো না বাবা আমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি!”

বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে ওড়ে নিতু।রিহান এতক্ষণে বুঝতে পারলো নিতুকে।প্রেগন্যান্ট অবস্থায় ওর পড়াশুনাটা ব্যাঘাত ঘটতে পারে।তারউপর ছয়মাস পর ওর ফাইনাল।সে’সময় ডেলিভারি সময় প্রায়।পড়াশুনা এবং বাচ্চা ডেলিভারি সময়টা একসাথে কীভাবে নেবে মেয়েটা?উফফ!বিষয়গুলো তখন কেন ভাবে নি রিহান!বাবা হওয়ার ঝোঁকটা মাথায় এতই চেপেছিল!রাগ উঠতেছে এখন তার নিজের উপর নিজেরই।নিতুকে কোনোমতে বুঝিয়ে উঠে পড়ে নিজের রিডিং রুমে চলে আসে রিহান।রুমময় পায়চারি করতে থাকে কি থেকে কি করা যায়।কিছুক্ষণ এভাবে পায়চারির পর একটা চেয়ার টেনে টেবিলের সামনে গিয়ে ধপাস করে বসে।পাশে প্যাড এবং একটা কলম ছিল।তা হাতে তুলে নেয়।নিতুর পরিক্ষার ডেট এবং কনসিভ হওয়ার ডেট হিসবে করতে লেগে যায়।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here