মনের কোণে🥀,সূচনা_পর্ব,২য়

0
234

মনের কোণে🥀,সূচনা_পর্ব,২য়
আফনান লারা
১ম

ব্যস্ত শহর,ব্যস্ত শহরের অলিগলি সব।এসব আবাসিক এলাকায় তারাই জায়গা করে নিতে পারে যারা এই এলাকারই মানুষ।
কড়া রোদ!মাথার উপর সূর্যটা খিলখিলিয়ে হাসে।তার হাসি কেউ মুখ তুলে দেখছেও না,বরং মাথায় হাত দিয়ে তার হাসি দেখার ভয়ে মুখ ঢাকছে।
সেই দৃশ্য দেখে সূর্য রাগ করে তাপ বাড়িয়ে দিলো।এরপর কেউ একজন চেয়ে বলবে’কেন এত গরম আজ?’
সূর্যের তখন পৈশাচিক আনন্দ হবে।

ঐসব ব্যস্ত অলিগলির একটি গলির কথা বলবো আজ।অনাবিল মেনশন থেকে একটু দূরে একটা ফাঁকা ভ্যানগাড়ি থেমে ছিল অনেকক্ষণ যাবত।চালক মনে হয় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ঠাণ্ডা আখের শরবত খেতে কাছাকাছি কোথাও গেছে।আখের শরবত বানায় একজন আখওয়ালা।আখ মেশিনে চেপে রস বের করে।রসটাকে ঠাণ্ডা রাখতে বিরাট বড় বরফের টুকরা বসিয়ে রেখেছে সামনে।গলাও ভিজবে,পুষ্টিও হবে।
সেই ভ্যানগাড়িটাতে বসে আছে দুজন মানুষ।
একজনের বয়স ২৪/২৫ হবে,আর আরেকজন একেবারেই ছোট।বয়স তার ৬/৭বছর হবে।দুজনে পা দুলাচ্ছে ভ্যানগাড়িতে চড়ে বসে।যিনি বড় তিনি বাচ্চা ছেলেটার গালে একটা করে থাপ্পড় মারছে আর বলছে’কি বললাম মনে থাকবে?’

বাচ্চাটা চড় খাওয়া গালে হাত দিয়ে মাথা নাড়ছে আর সাথে সাথে ঐ বড় ছেলেটার হাত জড়িয়ে ধরে বলছে,’প্লিজ ভাইয়া যেও না’

পঁচিশ বছরের যুবকের কপাল কুঁচকে গেলো।রাগ হলো সাথে হলো মায়ার প্রস্ফুটন।বাচ্চা ছেলেটার কান টেনে ধরে সে বললো,’দেখো নাহিদ,কতগুলো চড় মারলাম।ভাইয়ার কথা শুনতে হয়।যাও বাসায় ফিরে যাও।আর হ্যাঁ!তুমি বাবাকে ভুলেও বলবেনা আমি কোনদিকে গেছি।ঠিক আছে?’

নাহিদ মুখ বাঁকিয়ে গাল ফুলিয়ে বললো,’না তুমি যেতে পারবেনা।আমি তোমায় যেতে দেবোনা।তোমার হাতের চড় না খেলে পড়ায় মন বসেনা আমার।আমায় সাথে করে নিয়ে যাও না ভাইয়া। দেখো আমি হাতে করে আমার একটা জামা,টুথপেস্ট আর পেন্সিল বক্স ও নিয়েও এসেছি তোমার মত করে।
আমার আর কিছু লাগবেনা বাসার,চলো যাই’

‘রাতের বেলা যে ভূতের ভয়ে আম্মুর রুমে গিয়ে ঘুমাও সেটা??তোমায় নিয়ে গেলে আমার কত সমস্যা হবে জানো??তাহলে কেন বাচ্চামো করতেছো?তুমি দুধের শিশু?ক্লাস ওয়ানের ছেলে দুধের শিশু?’

‘আমি হয়ত দুধের শিশু না,তবে আমি ললিপপের শিশু।ভাইয়া আমায় নিয়ে চলোনা,চলোনা,চলোনা’

নাবিল নামের ছেলেটা ভ্যান থেকে নেমে নিজের জামাকাপড়ভর্তি ব্যাগটা ঘাড়ে তুলে নিয়ে বললো,’আমি তোমায় নিয়ে যেতে পারবোনা,শেষ কথা।বাসায় ফিরে যাও,বাবা এখন অফিস থেকে ফিরবে।’

নাবিল চলে গেলো।নাহিদ ওর ছোট ব্যাগটা নিয়ে নাবিলের পিছু পিছু চললো।নাবিল থেমে পেছনে তাকিয়ে কোমড়ে হাত দিতেই নাহিদ কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো নাবিলকে।নাবিল ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ পর ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বললো,’যে জিনিস আদরে মাথায় ওঠে সেই জিনিসকে আমি বেশি আদর দিই না।তোমায় ও দিচ্ছিনা,কখনও দিই ও নাই তারপরেও তুমি মাথায় উঠে গেছো।আমার হাতে উড়াধুরা মাইর খাওয়ার আগো আমি ১-৩ বলার আগে দৌড় দিয়ে বাসায় চলে যাবে,তা নাহলে মারতে মারতে গেট অবধি দিয়ে আসবো’

নাহিদ ছলছল চোখে তাকিয়ে চলে গেলো বাসার দিকে।নাবিল ও চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে ছিল।এখান থেকে সে বাড্ডায় যাবে সোজা।সেখানে তার জরুরি একটা কাজ আছে।আজকের পর থেকে সেই জায়গাটি তার বর্তমান থাকার জায়গা।
বাসে উঠে ফোন নিয়ে সিমটা খুলে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে নাবিল।মুখে হাসি ফুটিয়ে অন্য একটা সিম ফোনে ঢুকিয়ে নিয়েছে এবার।
বাড্ডার একটা প্রাইভেট আবাসিক ছাত্রাবাসে থাকবে সে এখন থেকে।সব রেডি করতে এক মাসের মতন লেগে গিয়েছিল।
সব চেয়ে বেশি কষ্টকর হয়েছিল বাবা মায়ের পরিবর্তে ভাড়া করা বাবা মা নেওয়া নিয়ে।চাইলেই কি কেউ আসল বাবা মা হতে পারে?তাদের বাবা মায়ের জায়গা দিতে গেলে সব শিখিয়ে নিতে হয়,সেই শেখানো যে কি কঠিন!একটা সময় নাবিলের মনে হয়েছিল ঐ নকল বাবা মাকে ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিতে।।
অনেক কষ্টে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে সে অভিভাবকের সাইনটা করিয়ে সেখানে থাকার সব বন্দবস্ত করে তারপর বাসা থেকে পালালো আজ।তার পালানোর কারণ পরে জানা যাবে।
যোহরের আজান দিচ্ছে।ভবনের পাশেই মসজিদ আছে।ওখানে নামাজ পড়ে নিয়ে তারপর ঢুকে যেতে হবে।
——
‘আমি জুতো খুলিয়া নামাজ পড়তে ঢুকেছিলুম মসজিদে।সন্নিহিত স্থানে আমার জুতোখানা গুছিয়ে রাখিয়াছিলাম।এরপরে নামাজ শেষে এসে দেখি আমার সেই কোমলমতী জুতো জোড়া গায়েব।জিলাপির খোঁজে আমার কোমলমতী জুতো খানা আমি হারাইলাম।আহা দুঃখ,তবে আমার দুঃখ কিঞ্চিত বিলীন হইলো দুটো জিলাপি আর আরেকটা ভাঙ্গা জিলাপি পাইয়া,সর্বমোট আড়াইখানা জিলাপি আমার হাতে হেলছে এবং দুলছে,নাচিয়া নাচিয়া’

‘কবি রামেশচন্দ্র সরি রামিশ ভাই! আপনার কবিতা বন্ধ করিয়া আমায় আমার জুতাটা খুঁজে দিবেন?’

‘তার আগে আমাকে আমার সাধু আর চলিত ভাষা সঠিকভাবে মিশ্রিত করতে সহায়তা করো ভৎস!!’

রামিশের কথায় জুনায়েদ হাসলো।হাসতে হাসতে নিজের জুতা খুঁজতে গিয়ে দেখলো নাবিলকে।সেও তার জুতা খুঁজতেছে।জুনায়েদ ওর দিকে চেয়ে বললো,’কি ভাই এলাকায় নতুন নাকি?’

‘হ্যাঁ,তবে মসজিদে নতুন না।জুতা আরও হারিয়েছি তবে…’

‘তবে?’

‘তবে এই জুতোটা আমার অনেক প্রিয়। আমার বাবা কিনে দিয়েছিল জন্মদিনে।এটা হারালে আমার ভীষণ খারাপ লাগবে’

রামিশ চশমা ঠিক করে বললো,’হারালে কি বলছো ভৎস?হারিয়ে গেছে।মাটি ভেদ করলেও আর পাবেনা।এই এলাকার চোরেরা খুব ডেঞ্জারাস।আমার কোমলমতী জুতাখানা হারাইলাম আমি’

জুনায়েদ কপাল কুঁচকে বললো,’দামি জুতা নাকি?’

‘বাবা দিয়েছে তাই দামি।দাম ৫হাজার হবে।সেটা বিষয় না, স্মৃতি বলেও তো কিছু আছে’

‘আমাদের তো ভাই দুশো তিনশো টাকার জুতা।তবে তোমার যেহেতু স্মৃতির জুতা, তোমায় আমি চোরের খোঁজ দিতে পারি।সিওর না,তবে তুমি গিয়ে দেখে আসতে পারো।ইশ!!গলির নাম ভুলে গিয়েছি।
রামিশ তোর মনে আছে?’

রামিশ তার ধুলোমাখা পাঞ্জাবি ঝেরে চশমাটা টেনে টুনে বললো,’চন্দ্রাহাট চিনো?ওখানে যে বস্তিটা আছে সেখানে গেলে পেতে পারো।কারণ ঐ জায়গায় চোরের আস্তানা অনেক বেশি,তবে সেটা তাদের বাসস্থান কিনা জানিনা।ধারণা দিলাম আর কি।ওখানে চুরি বেশি হয়।দেখো যেটা আছে সেটাও হারিয়ে ফেলোনা’

নাবিল ওদের ধন্যবাদ জানিয়ে চন্দ্রাহাটের দিকে চললো।এখান থেকে দশ মিনিটের পথ।গুগল দেখে হাঁটছে সে।
চন্দ্রাহাটে এসে তার চোখ কপালে।এত মানুষ হয়ত এর আগে সে কখনও দেখেনি।এখানে তো মানুষ উঠিয়ে নিয়ে গেলেও কেউ খেয়াল করবেনা।সবাই ব্যস্ত।
এত ভীড়ের মাঝে নাবিল হা করে চারিদিকটা দেখছে।কই থেকে কই খুঁজবে??

ঠিক সেসময়ে মনে হলো কাঁধের ব্যাগটা টান খাচ্ছে।মনে হলো কেউ কিছু নিচ্ছে নতুবা ছিঁড়ছে।
চোর ছাড়া আর কে হতে পারে ভেবে নাবিল না তাকিয়েই পিছনে ফিরেই ঘুষি মেরে দিলো।যাকে মারলো সে একটি মেয়ে ছিল।ঘুষি খেয়ে নিচে পড়ে গেছে মেয়েটি।গায়ে সাধারণ সেলোয়ার স্যুট।দেখে বোঝা যাবেনা এ চোর হতে পারে।
এত বড় দূর্ঘটনা ঘটে যাবার পরেও ঐ ব্যস্ত জায়গার কেউ ওদের দিকে তাকালোনা।যে যার গন্তব্যে যেতে ব্যস্ত।

নাবিল মেয়েটার হাতের দিকে চেয়ে দেখলো ধারালো ছুরি।
এরপর ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখলো অনেকটা কেটে ফেলেছে এত কম সময়ে।
মেয়েটা নাকে হাত দিয়ে উঠার চেষ্টা করতেই নাবিল আঙ্গুল তুলে বললো,’খবরদার!বসে থাকো।এত বড় মেয়ে হয়ে চুরি করতে লজ্জা করেনা তোমার?’

মেয়েটা এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন সে ছুরিটা এবার নাবিলকেই মেরে দেবে।নাবিল মেয়েটার কোমড়ে ফুলে থাকা দেখে ভাল করে খেয়াল করে দেখলো ওর জুতার ফিতা ঝুলছে।তার মানে এই সেই চোর যে মসজিদের সামনে থেকে তার জুতা নিয়ে এসেছিল।
সাথে সাথে নাবিল হাত দিয়ে জুতাটা নিয়ে নেওয়া ধরতেই মেয়েটা পিছিয়ে গিয়ে বললো,’খবরদার! আমার গায়ে হাত দেবেন না’

‘আমার জুতাটা ফেরত দাও’

‘ওটা আমার।আপনার কে বললো?’

‘তুমি ছেলেদের জুতা পরো?দাও বলছি?নাহলে আমি কিন্তু!!’

মেয়েটা কিছু বোঝার আগেই নাবিল ওর কোমড় থেকে টান দিয়ে জুতাজোড়া নিয়ে নিলো।মেয়েটা এবার ওর হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।নাবিল এদিকে টানছে আর মেয়েটা অন্যদিকে টানছে।

‘দেখে তো চোর মনে হয় না।এসব কে শেখালো?লজ্জা শরম কি কিছুই নাই তোমার?হাত সরাও,আমার কিন্তু মাথা সব সময় চড়গ গাছ হয়ে থাকে।চড় মেরে দেবো’

‘আপনার যে ঘুষি!! খেয়েই বুঝেছি আপনি কি জিনিস,তবে আমি সেই রকমই তৈরি অন্য জিনিস।আমি এটা ছাড়বোনা।এটা নিয়েই ছাড়বো।এই জুতাটা আমার লাগবে।দেড় ঘন্টা সময় নষ্ট করেছি এমন একটা দামী জুতা পাবার লক্ষ্যে।এটা আমি মরে গেলেও হাত ছাড়া করবোনা’

চলবে♥

মনের কোণে🥀
#পর্ব_২
আফনান লারা
.
নাবিল বুঝতে পারলো এই মেয়েটা ঝামেলা তৈরি করে বিরাট জোট পাকিয়ে ফেলতে পারে।তাই হাতটা ছেড়ে দিলো।
মেয়েটা জুতো জোড়া জড়িয়ে পিছোতে পিছোতে বললো,’যান এখান থেকে!দিনদুপুরে জুতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে,জুতার জন্য কি মরে যাবেন নাকি?’

‘কত টাকা চাই তোমার?আমায় জুতোটা দিয়ে দাও।আমি এর টাকা তোমায় দিয়ে দেবো’

‘টাকা লাগবেনা,আমার জুতোটা লাগবো।এত বড় মহান ব্যাক্তিত্ব দেখাতে হবে না আপনাকে।বাই’

নাবিল এবার খপ করে জুতাটা আবারও ধরে ফেললো।

‘আজব তো আপনি!আমি কিন্তু এই জুতা ছেড়ে যাবনা।আমার সাথে হাতাহাতিতে পারবেন ও না,আমার কিন্তু অভ্যাস আছে এসবের’

নাবিল ফোন বের করে ছবি তুলতে তুলতে বললো,’নাম বলো তোমার,পরিচয় দাও।ক বেলা ভাত না পেয়ে চুরিতে ঢুকছো ওসব বলো।ভিউ অনেক আসবে’

‘খুব খারাপ লোক তো আপনি!জুতার জন্য মানুষ এমন পাবলিসিটি করে??আশ্চর্য! ‘

‘পাবলিসিটি??? আরে বাহ! এ দেখি শিক্ষিত চোর!তারপর বলো শিক্ষিত হবার পরেই কি পথে বসেছো?’

মেয়েটা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে নাবিলের দিকে।হাত থেকে জুতাটা নিচে ছেড়ে দিলো এর কিছুক্ষণ পর।নাবিল নিচু হয়ে জুতাটা পরে নিলো পায়ে।মাথা তুলে সামনে চেয়ে দেখলো মেয়েটা নেই কোথাও।হাসি দিয়ে নাবিল তার ফোনের দিকে তাকাতে গিয়ে খেয়াল করলো ফোনটাই গায়েব।
কত বড় লস করে গেলো মেয়েটা।এবার মনে হচ্ছে জুতা দিলেই ভাল হতো।এখন আবার সিম তোলার ভেজাল করতে হবে।’
—–
‘এই নাও!আজকের জিনিস দেখলে তোমার অন্যদের জিনিসের আশায় বসে থাকতে ইচ্ছে করবেনা’

‘ফোনটার দাম পনেরো আঠারো হাজারের উপরে হবে তবে আমি বারো তেরো হাজারে বেচতে পারবো।নে পানি খা।এটাতে কিন্তু ৩ হাজার দিব ‘

‘নিজেও বেচতে পারতাম।তোমার হাতে দিছি।তিনে হবেনা।বাড়াও’

‘আচ্ছা চার দিব?রাজি?’

মেয়েটা চেয়ারে বসে পানির বোতল নিয়ে পানি খেয়ে জামিলা বেগমের দিকে চেয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।জামিলা মুখে পান পুরে ফোনটাকে উল্টেপাল্টে দেখছে’

ছাত্রাবাসের কাছাকাছি আসতেই নাবিলের আবার দেখা হয়ে গেলো জুনায়েদ আর রামিশের সাথে।ছাত্রাবাসের সামনে একটা চায়ের দোকান ছিল মসজিদের কাছে ঘেঁষেই।নাবিলকে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাক দিয়েছে তারা।
ভর দুপুরে তাদের দুজনের হাতে রঙ চা।নাবিল ওদের সাথে বসতেই দোকানদার এক কাপ চা ওর হাতেও ধরিয়ে দিয়েছে।তার নাম মতিন।এই দোকান চালান দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে।বাপ দাদার সম্পত্তি।এই ছাত্রাবাসের সকলকে তার চেনা,আজ নাবিলকেও চিনে নিলেন।

‘বাবা তুমি নতুন নাকি এখানে?’

‘হুম’

‘তাহলে তো তোমায় দিনে পাঁচবার আমার হাতের চা খাইতেই হবে নাহলে কিন্তু আমি রাতের বেলা সুযোগ সুবিধা পাইতে দিমুনা’

নাবিল চায়ে চুমুক দিচ্ছিলো।মতিন ভাইয়ের কথা শুনে কপাল কুঁচকে তাকালো।
জুনায়েদ হেসে বললো,’রাতের সুযোগ সুবিধা কি তোমাকে আজই বুঝিয়ে দেবো।তুমিও তো এখানে থাকবে তাইনা?’

‘হ্যাঁ’

‘কত লোক আসিলো,গেলো
পেলো তাদের জুতাখানা
পাইলাম না কেবল আমি
হে চোর,তুমি মোরে করিয়াছো অতিষ্ঠ ‘

জুনায়েদ রামিশের কাঁধে হাত রেখে চায়ের শেষ চুমুকটা নিয়ে কাপ রেখে বললো,’পকেটমানি পেলে তোকে জুতা কিনে দেবো।ভাবিস না।এখন ওয়াশরুমের জুতা পরে কাটা।
তা ভাই তোমার জুতা পাবার অসাধ্য সাধন করলে কি করে?’

নাবিল ছেঁড়া ব্যাগের দিকে চেয়ে থেকে বললো,’তোমরা যে বলেছিলে যেটা ছিল ওটাও হারাবো।কথা মিলে গেছে,
ফোন হারিয়ে ফেলেছি।তবে জুতা পেলাম এটাতেই খুশি হলাম’

‘ফোন হারিয়ে তুমি এত স্বাভাবিক?আমি তোমার জায়গায় হলে কাঁদিয়ে ভাসিয়ে ফেলতাম।একেবারে ছাত্রাবাস থেকে চন্দ্রাঘাট পর্যন্ত।’
—-
অনাবিল মেনশনের মালিক জনাব অনাবিল ওসমান দুপুর তিনটা দশ মিনিটে তার বাসায় ঢুকেছেন।সারা বাসায় নিস্তব্ধতা বিদ্যমান।সবার মুখের ভাষার আজ কোনো শব্দ নেই।
ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রয়িং রুমে বসেছেন অনাবিল।একটা খাম ছিঁড়ে ভেতরের কাগজটা দেখে সেটাকে সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন,’সামিয়া নাবিলকে ডাকো।ওর পাসপোর্ট এসে গেছে।পরের সপ্তাহে ফ্লাইট।বলো ভিমরোতি ছেড়ে কাজে মনযোগ দিতে।’

সামিয়া নাবিলের মা।অনাবিলের কথা শুনে হাতে পানির গ্লাস নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডাইনিং টেবিল ঘেঁষে।

‘কি হলো সামিয়া?কথা কি শুনোনি?’

নাহিদ ফুটবল হাতে লুকিয়ে লুকিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছিল তখন। দুপুরে বাবা খেলতে দেয়না বলে লুকিয়ে যাচ্ছিলো সে।

‘নাহি দাঁড়াও’

নাহিদ থমকে জিভে কামড় দিয়ে চুপ করে আছে।জনাব অনাবিল এগিয়ে এসে ওর দিকে লক্ষ করে বললেন,’নাবিল কোথায়?’

‘জানিনা! কিছু জানিনা’

‘নাবিলের ব্যাপারে যদি কেউ এক বিন্দু ও কিছু জেনে থাকে তবে সেটা তুমি।বলবে নাকি মারতাম?’

নাহিদ ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে।সামিয়া এগিয়ে এসে বললো,’বাদ দিন না,ও হয়ত জানেনা’

‘তুমি কিছু বলবেনা।তোমার আদরে দুটো বিগড়ে গেছে।কিরকম বিগড়ে গেছে তা ও আজ বাসায় আসলে বুঝতে পারবো’

‘ভাইয়া আর আসবেনা।চলে গেছে অনেকদূর’

‘কোথায় গেছে?’

‘সানফ্লাওয়ার বাসে উঠতে দেখেছি, আর কিছু দেখিনি’

জনাব অনাবিল হনহনিয়ে গিয়ে সোফায় বসলেন আবার।ফোন নিয়ে গার্ডকে কল করেছেন।গার্ড ছুটে আসার পর ওকে বললেন বাসার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে চেক করতে।স্টেশন দেখা যায় কিনা’
—-
একটা রুমে চারটা বেড।বাম পাশে একটা তার উপরে আরেকটা।ডান পাশেও একই।মাঝখানে দুটো জানালা।জানালার সামনে লম্বা টেবিল।হাঁটার জন্য চিকন জায়গা আছে অবশ্য।
মানে পরবো আর ঘুমাবো।আর কোনো কিছুর জায়গা নাই।
নাবিল ব্যাগ রপখে জানালাটা দেখতে চাইলো।তাই টেবিলে উঠে বসে জানালায় হাত রেখে বাহিরে চেয়ে দক্ষিন পশ্চিমে চোখ বুলিয়ে বললো,’দূরে ওটা কি স্কুল?’

জুনায়েদ গেঞ্জি পাল্টাতে পাল্টাতে বললো,’নাহ।গার্লস হোস্টেল।আমাদের ছাত্রাবাসের মেইন মালিক বুদ্ধি করে গার্লস হোস্টেলের কাছাকাছি ছাত্রাবাস তৈরি করেছে যাতে করে ছেলেরা সকাল -বিকাল মেয়ে দেখে পড়াশুনায় মন দিতে পারে।একটা মোটিভেশন আর কি’

নাবিল মাথা বাঁকিয়ে বললো,’কেমন মোটিভেশন? ‘

‘ঐ যে বিসিএস ক্যাডার হলে সুন্দরী বউ পাওয়া যায়,এইরকম গার্লস হোস্টেলের সুন্দর একটি মেয়ের জামাই হওয়া যায়, সেটা হলো মোটিভেশন।’

নাবিল তাচ্ছিল্য করে হেসে টেবিল থেকে নেমে বসলো বিছানায়।বিকালে বের হয়ে একটা ফোন কিনতে হবে।আম্মুকে বলেছিল বিশ হাজার টাকায় এক মাস চলবে।এখন এই টাকায় ফোন কিনে কল করে বলতে হবে বিশ হাজার আবার পাঠাতে।শুরতেই চোরের খপ্পরে পড়তে হলো।
‘ঐ মেয়েকে আর একবার হাতের নাগাড়ে পাই আমি।আমার ফোন নিছেনা??আমি ওর হাতে যা থাকবে তা নিয়ে চলে আসবো।’

জুনায়েদ গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে বললো,’শোনো আজকে রবিবার,আজকের মেনু হলো বোয়াল মাছের ঝোল,আর দুই বালতি পানি মেশানো মসুর ডাল সাথে বিলাতি ধনেপাতার ভর্তা।খেতে এসো নাহলে এগুলো ও জুটবেনা।শেষের খাবারে কণা,বালু থাকে।আগের গুলা খাওয়ার চেষ্টা করবে’

নাবিলকে সব বুঝিয়ে জুনায়েদ চলে গেছে।রামিশ তার সিটে বসে কবিতা লিখছে আর গুনগুন করে।ফোন ছাড়া মন টিকেনা কোথাও নাবিলের।ইচ্ছে করে এখনই গিয়ে একটা ফোন কিনে আনতে।সিম কিনে আনতে।সিম তুলতে গেলে কাগজপত্র লাগবে, সব তো বাসায়।
তার চেয়ে বরং নতুন সিম নিতে হবে।একদিনে দুটো সিম গেলো।
‘ফোনের দোকান খুলবে বিকেলে।ততক্ষণে সময় কি করে কাটাই!!’

রামিশ কবিতার নোটবুকটা রেখে চশমা খুলে চোখ কচলাতে কচলাতে বললো,’ওহে বালক!সময় না কাটলে ছাদে যাও।লাল পরী, নীল পরী,সবুজ পরী, হলুদ পরী,ডানাকাটা পরী সব কিছুর দেখা পাবে।জলদি যাও।এখনই তো সসময়।দুপুর বেলা,রোদে খাঁ খাঁ!!রমনীরা ভেজা চুল শুকাতে ছাদে এসে কিচিরমিচির করবে’

‘এই ছাদে?’

রামিশ ড্রয়ার খুলে দূরবীন বের করে নাবিলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,’চলো যাই।আমিও রমনী দেখবো আর কবিতা লিখবো।কবিতার নাম হবে’রমনী ধরণী কল্যানী’
কিন্তু রমনীরা এই ছাদে না,ঐ ছাদে।দূরবীন দিয়ে সামনে মনে হয়।
ইশ!! মাঝে মাঝে মনে হয় ভেজা চুলের গন্ধ আমার চোখের সামনে।হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে!!’
—-
‘লিখি??এই লিখি?’

‘কিই??কান আছে,শুনতেছি।বলে ফেল’

‘বিকালে যে রচনা জমা দিতে যেতে হবে ভার্সিটিতে, মনে নেই?দুপুরে না খেয়ে ঘুমাচ্ছিস কেন?’

‘তো কি করবো?বাসার প্যারা থেকে বেরিয়ে হোস্টেলে এসেও শান্তি নাই দেখছি।তোর মতন একটা বেস্টু আম্মুর মতন সারাদিন কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবেই’

‘রচনা প্রতিযোগিতায় জিততে হবেনা?তুই তো লিখছিলি দেখলাম।’

‘সময় হলে দেবো।আগে ভাগে ভার্সিটি গিয়ে টইটই করে ঘোরার শখ নাই আমার।তোর মন চাইলে যা।আমায় একটু রেস্ট নিতে দে।এমনিতেও দেড় ঘন্টা…

‘দেড় ঘন্টা?’

‘না কিছুনা,যা তুই।আমি একটু ঘুমাবো।বিকাল চারটার দিকে তুলে দিস’

চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here