মোহ_মায়া সানজিদা_বিনতে_সফি পর্ব_২৫

0
136

#মোহ_মায়া
#সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_২৫

ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ইসহাকের সাথে দেখা হয় তানিয়ার।দুজনের দেখা টা অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই হয়।ইসহাক তখন শীতের ছুটিতে সম্রাটদের বাড়িতে বেরাতে এসেছে। সাথে সুমন,সায়েম ও আছে।গ্রামের পরিবেশে শীতের সকাল মানে অন্যরকম অনুভূতি।

সকাল সকাল গ্রাম সফরে বেরিয়ে পরে চার বন্ধু।উদ্দেশ্য নতুন খেজুরের রস খাওয়া।গ্রামের সবচেয়ে বড় খেজুরের বাগানটি তোফায়েল মেম্বারের।তাই সম্রাট সবাইকে নিয়ে মেম্বার বাড়ির দিকে হাটা ধরলো।গ্রামের আকা বাকা পথে হেটে যেতে দশ মিনিট লাগে।কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে ও যায় ওরা।কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন বাগানের সামনে কিছু ছেলেদের দাড়িয়ে থাকতে দেখে। তারা এদিক ওদিক উকি ঝুঁকি দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করছিল। গ্রামের এক চাচার সাথে দেখা হতেই তার সাথে কুশল বিনিময় করতেই বন্ধুদের থেকে কিছুটা পিছিয়ে পরে সম্রাট।

সকাল সকাল ব্রাশ হাতে নিয়ে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে কল পারে হাজির হলো তানিয়া।ঘুম ঘুম চোখে চারিদিকে তাকাতেই নজর গেলো খেজুর বাগানের দিকে। কয়েক টা ছেলে কে দেখেই বুঝে নিলো ওরা খেজুরের রস চুরি করতে এসেছে।

মেম্বারের বাড়িতে চুরি! এতো বড় সাহস! মেম্বারের মেয়ে হয়ে এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নিজেকে দেবসেনা ভেবে হাতে তলোয়ারের বদলে বাশ নিয়ে এগিয়ে যায় বাগানের দিকে।

সুমন আর ইসহাক কিছু একটা নিয়ে কথা বলছিল। ছেলে গুলো ওদের দেখেই এখান থেকে কেটে পরেছে।

হঠাৎ করে মাথায় জোরে আঘাত পেতেই মাথাটা ঝা ঝা করে উঠে ইসহাকের।কেউ একজন মোটামুটি শক্তি দিয়েই যে তাকে আঘাত করেছে এটা সে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। মাথা ফেটে না গেলেও অনেকটা ফুলে গেছে এটা নিশ্চিত।

সুমন আর সায়েম দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইসহাক আর তানিয়ার দিকে। তানিয়া ও অনেক টা ভেবাচেকা খেয়ে গেছে ওদের দেখে।হা করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ইসহাকের ব্যাথাতুর মুখের দিকে।

— এই মেয়ে, পাগল তুমি? এভাবে মারলে কেন?

ইসহাকের মৃদু চিৎকারে কিছুটা কেপে উঠে তানি।

— এতো সকালে কারোর বাগানের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে মানুষ চোর ই মনে করবে এতে আমার কি দোষ!

তানির কথা শুনে অবাক হয়ে তাকালো সুমন আর ইসহাক। সায়েম ছোট খাটো একটা আর্তনাদ করে উঠলো চোর শব্দটা শুনে।

— নাউজুবিল্লাহ। আপা মনি আপনি চোর কি আমাদের বললেন? (অবাক হয়ে)

— চোর বলি নি। বলেছি মানুষ ভাবতে পারে।আপনাদের চোর কেন বলতে যাবো! (অসহায় গলায়)

— তাহলে মাথায় মারলে কেন বেয়াদব মেয়ে।(দাতে দাত চেপে)

নিজেকে বেয়াদব উপাধি দিতেই তেতে উঠলো তানি।অনেকটা রাগ নিয়েই বললো,

— একদম বেয়াদব বলবেন না। আমি কোন বেয়াদবি করি নি। অন্যের বাগানে উঁকি মেরেছেন আপনি। তাই আমি আপনাকে ভুল করে আঘাত করে ফেলেছি।আমি কেমনে বুঝবো আপনি এতো সকালে এখানে গল্প করতে এসেছেন।

তানির কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেলো ইসহাক। এইটুকু পুচকি মেয়ে কতো বড় বড় কথা শোনাচ্ছে!

— আর একটা বাজে কথা বললে তোমাকে তুলে আছাড় দিবো অসভ্য মেয়ে।ভদ্রতা শেখো নি?মানুষের সামনে কিভাবে বিহেইভ করতে হয় জানো না?

অবস্থা বেগতিক দেখে সুমন ইসহাক কে শান্ত করার চেষ্টা করলো,টেনে কিছুটা দূরে নিয়ে এসে বললো,

— বাদ দে না ভাই।ছোট মানুষ বুঝতে পারে নি।সকাল সকাল চিৎকার করে মানুষ জরো করার কোন মানেই হয় না।

ইসহাক এখনো রাগে ফুসছে।তানি তো পারলে এখনি ওকে লবণ মরিচ দিয়ে চিবিয়ে খায়।

অবশেষে সম্রাট এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। সম্রাট ওদের অবস্থা দেখে তো থ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। ভোর বেলা ঘুরতে এসে কি একটা লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরতে হলো এটা ভাবতেই তপ্ত নিশ্বাস ছাড়লো সম্রাট।

সারা রাস্তা সায়েম ইসহাকের মাথা চেক করেছে আর হু হা করে হেসেছে। ইসহাক কয়েক ঘা দেয়ার পরেও তার কোন হেলদোল নেই। কিছুক্ষণ পর আবার হু হা করে হেসে উঠছে।তবে এবার সাথে সুমন আর সম্রাট ও যোগ হয়েছে।

নিজেদের প্রথম দেখার কথা মনে হতেই তপ্ত নিশ্বাস ছাড়লো তানি।এখন এগুলো শুধু ই অতীত।জীবনের তিক্ত অতীত গুলো সব সময় অনাকাঙ্ক্ষিত হয়।সবার মতো ওদের ও একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক হতে পারতো। যেখানে ভালোবাসা আর বিশ্বাসের কোন অভাব হতো না। কিন্তু ভাগ্য হয়তো তা চায় না।তাইতো বিশ্বাস আর ভরষা এতো নির্মম ভাবে ভেঙেছে।

🌸

— কি ব্যাপার! এতো চুপচাপ কেন?

সায়েমের কথা শুনে মলিন হাসলো ইসহাক। আর চোখে তানি কে দেখে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।মেয়েটা কে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে ও।বিশ্বাস আর ভরসা অর্জন করে ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে ছিলো সে।তারপরে ই তো নির্মম ভাবে মেয়েটা কে ছেড়ে এসেছে। মেয়েটার কান্না,চিৎকার,আকুতি কোনটাই তার মন গলাতে পারেনি। এতো কিছু করেও কি তার শান্তি মিলেছে? মেয়েটাকে তো উচিৎ শিক্ষা দিতে চেয়েছিলো। দিয়েছে ও। তবুও কেন মনের ভিতরে অপরাধ বোধ কুরে কুরে খায়।

তানির হাসির শব্দে ধ্যান ভাঙলো ইসহাকের। মেয়েটা এখনো ঠিক আগের মতোই খিলখিল করে হাসে।তবে এখন আর এই হাসি তে প্রাণ নেই।আগে এই হাসি দেখেই বিরক্তিতে কপাল কুচকেছে সে।আর এখন সেই প্রাণবন্ত হাসি দেখার আশায় বার বার আর চোখে তাকাচ্ছে।

— আর কতক্ষন এমনে হাঙর মাছের মতো হা কইরা বইয়া থাকমু।খিদা লাগছে তো।কিছু খাইতে দে বইন।

তানির কথা শুনে আমি কপাল কুচকে তাকালাম ওর দিকে। মেয়েটা আর পাল্টালো না।তবে ওকে এভাবেই ভালো লাগে।

— খাবার চলে এসেছে রেস্টুরেন্টে থেকে। তোর প্রিয় খাসির মাংস ও আছে। আয় আমার সাথে। সব কিছু গুছিয়ে একসাথে সবাই খেতে বসবো।

আমার কথা শুনে সায়েম ভাইয়া অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। অভিযোগের সুরে সুমন ভাইয়া কে বললো,

— দেখলি দেখলি।কিভাবে এখানে সবাইকে সার্ভ করে খাওয়াচ্ছে। অথচ বাড়িতে এক গ্লাস পানি ও ঢেলে খায় নি।আমার মনি একটা আস্ত মীরজাফর পয়দা করছে।’এই মাইয়া তোর লজ্জা শরম নাই?

— নাহ।(স্বাভাবিক ভাবে)

— আমি আগে থেকেই জানতাম।তবু্ও তোর মুখের থেকা শুনতে চাইছিলাম।

আমাদের কথার মাঝেই সম্রাট ভাইয়ার ডাক পরলো।সে রুম থেকে চেচিয়ে আমাকে ডাকছে।আশ্চর্য! এভাবে ষাড়ের মতো চেচানোর কি আছে আজব!

সবাই মিটমিট করে হাসছে। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। ছিঃ ছিঃ।
আমি কোন রকম ওখান থেকে পালিয়ে আসলাম।রুমে ঢুকে কোন দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলাম,

— বলি বাসায় কি ডাকাত পরেছে?এভাবে চেচিয়ে বাসা মাথায় তোলার মানে কি?(রেগে)

— আমি এদিকে জান।ওদিকে কাকে বলছিস?

সম্রাট ভাইয়ার গলা অনুসরণ করে তাকাতেই চিৎকার করে নিজের চোখ ঢেকে নিলাম।তাওয়াল পরে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি! লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছে নাকি!আল্লাহ!সুস্থ স্বাভাবিক ছেলেটা হঠাৎ করে পাগল কেমনে হইলো?

— আস্তাগফিরুল্লাহ।এভাবে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছেন কেন? লজ্জা শরম কি সাগরে ফেলে দিয়েছেন নাকি?

আদওয়ার বেহুদা রিএকশন দেখে বিরক্ত হলো সম্রাট।মেয়েটা সব সময় দুই লাইন বেশি বোঝে।

— আদুসোনা।

সম্রাট ভাইয়ার এমন আদুরে ডাক শুনে আমি সন্দিহান চোখে ডাকালাম তার দিকে।আমাকে তাকাতে দেখে সম্রাট ভাইয়া এক ভুবন ভুলানো হাসি দিলেন।হায়য়য়,এই হাসি তে আমি অর্ধেক খুন হতেও প্রস্তুত।

— জানসোনা।একটু বারান্দায় যাও তো। তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।

সারপ্রাইজের কথা শুনে আমাকে আর পায় কে।আমি লাফাতে লাফাতে বারান্দায় চলে গেলাম। বারান্দায় আসতেই আমার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। অত্যন্ত সুন্দর দুটো লাভবার্ডস। ওয়াও।আমার একমাত্র দুর্বলতা।

সম্রাট ভাইয়া চেচিয়ে সুমন আর সায়েম ভাইয়া কে ডাকছে।এই লোকটা কখন কি করে কিছুই আমার মাথায় আসে না।

আমি নাচতে নাচতে রুম থেকে বেরুতে নিতেই সম্রাট ভাইয়া আমাকে আটকে দিলো।ওনি অলরেডি চেঞ্জ করে ফেলেছেন।ক্যাজুয়াল পোশাকে ওনাকে মারাত্মক লাগে।

— কি হলো? হাত ছাড়ুন।আমি তানি কে ডেকে নিয়ে আসি।পাখি গুলো দেখাতে হবে তো।

— চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাক।সুমন আর সায়েম ও আসছে।

— তো আমি কি করবো?? (অবাক হয়ে)

— তুই কেন কিছু করতে যাবি।আমি ই ওদের সামনে তোর সাপে রোমান্স করবো ষ্টুপিড। (দাতে দাত চেপে)

— লা হাওলা লাকুয়াতা।কি সব ছিঃ মার্কা কথা এগুলো।

চলবে,,৷
(রিচেক হয় নি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here