শেষের_পঙক্তি লেখনীতেঃ নুরুন্নাহার_তিথী পর্ব_৩

0
83

শেষের_পঙক্তি
লেখনীতেঃ নুরুন্নাহার_তিথী
পর্ব_৩
হঠাৎ মিহালের মুখ নিঃসৃত বাক্যটা যেনো উপস্থিত সকলকে স্তব্ধ ও বিমূঢ় করে তুললো। আর যাকে উদ্দেশ্য করে এই রুঢ় বাক্যব্যয়! সে নিজের অক্ষিযুগলের সম্মুখে সব কিছু যেনো কালোমেঘের মতো আঁধার দেখছে। মিহালের বলা কথাটা ছিল,

–আই এম এনগেইজড উইথ তানজিনা। স্যরি আই কান্ট একসেপ্ট ইউর লাভ। ফরগিভ মি।

মিহাল কিন্তু কথাটা বলে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে নি সেই স্থানে। তূর ছাদের মেঝেতে ধপ করে বসে পরে। শক্তিহীন মনে হচ্ছে নিজেকে তার। কিছুক্ষণ স্তব্ধ ও নির্বাক থেকে হুট করে নিজের দুই হাত দিয়ে মাথা ও চুল খা*মচে ধরে চিৎকার করে কান্না শুরু করে। অর্করা তূরের চিৎকারে ভয় পেয়ে দৌঁড়ে তূরের কাছে যায়। এতক্ষণ ওরা পুরো ঘটনাতে এতোটাই স্তব্ধ হয়েছিল যে তূরের কি অবস্থা হতে পারে তা তারা খেয়াল করে নি। ইরা ও ইতি গিয়ে তূরকে জাপটে ধরে। তূরের কান্না থামানোর চেষ্টা করছে ওরা। কিছুক্ষণ পর তূর নিস্তেজ হয়ে দেহের সব ভার ইরা ও ইতির উপর দিয়ে দেয়। মূলত তূর সেন্সলেস হয়েছে।

ফ্ল্যাশব্যাক এন্ড———

মিহাল ওর মাকে ডোন্টকেয়ার ভাবে জবাব দেয়,
–সে আমার বউ না যে তাকে আমার সময় দিতেই হবে। হবু বউ ও বউয়ের প্রতি পার্থক্য আছে। আর তানজিনার গা ঘেঁষাঘেঁষি স্বভাব আমার পছন্দ না। বিয়ের ঠিক এক সেকেন্ড আগেও আমি চাইবো, এমন কিছু হোক যার দরুন আমি তানজিনার থেকে রেহাই পাবো!

মিহালের মা হতভম্ব হয়ে গেলো। সে এরকমটা আশাও করেন নি। তার বান্ধুবীর সাথে অনেক আগে থেকে কথা বিয়েটা নিয়ে। মিহালের মা আরো কিছু বলতে মুখ খুলতে চাইলেন কিন্তু মিহাল তার আগেই তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

–তোমার যদি তানজিনার টপিক ছাড়া ভিন্ন কিছু বলার থাকে তবে বলো। আর না থাকলে, প্লীজ লিভ মি এলোন। আমি অনেকটা টায়ার্ড। আছে ভিন্ন কিছু বলার?

মিহালের মা কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে গেলেন। মিহাল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো। তারপর নিজের সুইচ অফ করা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সেটাকে সুইচ অন করার প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা থেকে আর করলো না। সুইচ অন করলেই যদি তানজিনার কল বা মেসেজ আসে!
মিহাল কয়েকমিনিট রেস্ট করে মাগরিবের নামাজটা পড়ে রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পরে। নেত্রপল্লব যেনো নিদ্রাতে মুদিত হতে চাইছে।

_______
মাগরিবের পর তূরের শরীরও আর সায় দিচ্ছে না জেগে থাকতে। জার্নির ধকল এখন হারে হারে টের পাচ্ছে। লং জার্নির কারনে এখন ঘুমালে ঘুমটা অনেক গভীর হবে তাই একেবারে রাত ৮.৩০ টার মধ্যে ডিনার করে এশার নামাজ পড়ে ঘুমাবে। নাফিহা ও তূর্য দুইজনে তূরের আনা চকলেট ভাগাভাগিতে লেগে গেছে। চকলেট তো তূরেরও খুব পছন্দ কিন্তু দীর্ঘসময় নিজের অনেক পছন্দ ও আবদার গুলোকে মনের গুপ্ত সিন্দুকে তালাবন্ধ করে রেখেছে। তূরের খুব ইচ্ছে ছিল, “মিহালের সাথে বিয়ে হলে মিহাল ওকে ফুলসজ্জার রাতে অনেক অনেক চকলেট দিবে। সাথে কাচের চুড়ি ও ফুল। বাকি আর কিছু দেক বা না দেক। ”
এগুলো ওর উইশ লিস্টে আছে। তূরের পাশে নীরা এসে বসে সাথে তূরের পছন্দের লেবুচা। হালকা চা-পাতি ও বেশি করে মশলাপাতি সাথে কড়া লেবু ও চিনি। নীরা তূরের হাতে চায়ের কাপ দেয়। তূর ওর রুমের ব্যালকনিতে বসে রাতের আকাশ দেখছিল। চন্দ্রমা আজ তার পূর্ণিমা রূপে আছে। অবশ্য আজ পূর্ণিমা না। ভরা পূর্ণিমা দুয়েকদিন আগেই চলে গেছে। সন্ধ্যা ৭.৩০ টার মতো বাজে। নীরার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে তাতে এক চুমুক দিয়ে প্রশান্তিতে বলে,

–জানিস, আমি এই চার বছরে একবারও লেবুচা বানাই নি আর পানও করি নি। আমার জিহ্বা হয়তো লেবুচাকে খুব বেশি পরিমানে মিস করছিল তাই তোর বানানো চা টাও অমৃত মনে হচ্ছে।

নীরা তার বড়ো বোনের কথায় ভ্রুঁ কুঁচকে নিজের চায়ের কাপে চুমুক দেয়। দুই কাপ চা এক সাথেই বানিয়ে তারপর কাপে ঢেলেছে সে। নীরা চুমুক দিয়ে তূরের দিকে তাকায় যেভাবে বাচ্চারা ধরা পরলে ঠোঁট ফুলিয়ে চোরা চোখে দৃষ্টি দেয় তেমন ভাবে। তূর সেটা দেখে ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর নীরার এক গাল টেনে বলে,

–আমি তো জানি তুই চায়ে লেবু ও চিনির পরিমান একসাথে সঠিক বুঝতে পারিস না। এমনকি টেস্ট করেও বুঝতে পারিস না। তবে চা টা কিন্তু জোস হয়েছে। দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় পর চা পান করছি তো। এই নে উম্মা!

নীরাও তূরের দুষ্টুমিতে হেসে ফেলে। তূর আকাশের দিকে তাকিয়ে চা পান করছে। দৃষ্টি যেনো একনিষ্ঠ নিবদ্ধ ওই গোল থালার মতো চাঁদের দিকে। নীরা কিছুক্ষন তূরের দিকে তাকিয়ে থেকে তূরের হাতের উপর নিজের হাত রেখে বলে,

–আপু! তুই কি ঠিক আছিস? তোর খুব কস্ট হচ্ছে! তাই না?

তূর হেসে নীরার দিকে তাকায় তারপর বলে,
–উহুম। বাদ দে সেসব কথা। বাবা-মা তো চাইতো আমি যেনো আর কোনোদিন দেশে না আসি আর না মিহালের সামনে পরি। কিন্তু যদি নিয়তিতে সাক্ষাৎ লেখা থাকে তাহলে আমরা শত বাঁধা অতিক্রম করে হলেও সেই স্থানে সেই সময় উপস্থিত হবো। উপরে একজন সঠিক পরিকল্পনাকারী তো আছেন। তিনি কর্মের মাধ্যমে ভাগ্য বদল করেন ঠিক তবে বদল করা ভাগ্যটাও তিনি আগে লিখে রাখেন। যদি কর্ম করি তবে সেটা আমাদের ধাপে ধাপে প্রদান করবেন। নয়তো না। সঠিক সময়ে যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেই তবেই আল্লাহ্ আমাদের সহোযোগিতা করবেন। যদি সবকিছু মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতো তবে রবের প্রতি বিশ্বাস থাকতো না কারো। আচ্ছা, সেসব বাদ দে। আগে এটা বল? আমি আসার পর থেকে তুই আমাকে আপু! আপু! বলছিস কেনো? আমাকে তো তুই কোনো কারণ ছাড়া আপু ডাকিস না!

নীরা চায়ের খালি কাপটা রেখে তূরকে জড়িয়ে ধরে বলে,
–তোকে কিছু বলার ছিল।

তূর এক ভ্রঁ উঁচিয়ে ইশারা করে। ব্যালকনিতে লাইট জ্বালানো নেই বা রুমেও জ্বালানো নেই। চাঁদের আবছা আলোতে নীরা কিছুটা বুঝতে পেরেছে আগের অভিজ্ঞতা থেকে যে তূরের ফেসিয়াল রিয়াকশন কেমন হতে পারে। নীরা একটু লাজুক স্বরে বলে,

–আসলে..

তূর তাকিয়েই আছে জানার জন্য। নীরা আবারও বলে,
–আসলে কিভাবে বলি!

তূর নীরার মাথায় চা’টা মে’রে বলে,
–তোমারে কি এহন ফুল দিয়া মনোরঞ্জন করতে হইবো? যা বলবা জলদি বলে ফেলো। নাহলে কিন্তু মুই আম্মুর কাছে গিয়া কমু যে তার মেঝো মাইয়া প্রেম করে! কি এহনও ভাব দেহাইবা?

নীরা হেসে ফেললো তূরের এরকম ভাষা শুনে। যেনো তেনো হাসি না! ব্যালকনির ফ্লোরে বসে পরেছে সে হাসতে হাসতে। তূর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে নীরা বলে,

–তুই কিন্তু সঠিক আইডিয়া করেছিস। আই এম ইন লাভ উইথ সামওয়ান।

তূর এবার গোল গোল চোখ করে নীরার পাশে ধপ করে বসে পরে বলে,
–রিয়ালি! যাক তুইও তাহলে এই বিষাক্ত সুধা পান করেছিস!

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here