শেষের_পঙক্তি লেখনীতেঃ নুরুন্নাহার_তিথী পর্ব_৪

0
73

শেষের_পঙক্তি
লেখনীতেঃ নুরুন্নাহার_তিথী
পর্ব_৪
তূর নীরার কাছে থেকে জানতে চাইলো,
–ছেলেটা কে? সে তোকে ভালোবাসে তো? নাকি আমার মতো একতরফা?

নীরা লাজুক হেসে বলে,
–সে নিজে আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রেপোজাল দিয়েছেন। এখন আমি যদি হ্যাঁ বলি তাহলে উনি তার বাবা-মাকে নিয়ে আসবেন। কিন্তু আমার কেনো জানি খুব ভয় হচ্ছে! দুই-তিন দিন দেখেই বিয়ে প্রেপোজাল! আমার আগে কি তার জীবনে কাউকে ভালো লাগে নি? সবকিছু মিলিয়ে আমি দ্বিধান্বিত। তাকে যে আমারও ভালো লেগেছে কিন্তু আমি যে তোর মতো যন্ত্রণা পেতে চাই না।

তূর হাসলো তারপর নিকষকালো অম্বরের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে উদাস কন্ঠে বললো,
–ভালোবাসাতে কোনো, কিন্তু, কেনো এসব থাকে না। যদি সে তোমার হয় তবে আজন্ম সে তোমার অপেক্ষাতে থাকবে অথবা তোমার উপস্থিতিতে বিলীন হবে তার অস্তিত্ব! এজন্যই বলে,
“কারো প্রথম ভালোবাসা হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার তবে শেষ ভালোবাসা হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।”
হতে পারে তার জীবনের প্রথমে কেউ ছিল আবার নাও থাকতে পারে। সে তো তোকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। এখন বাকিটা আল্লাহ্ ভালো জানেন।

নীরা তূরের কাঁধে মাথা রেখে মুচকি হাসে। তার বোনটা যে খুব সুন্দর করে মানুষকে বোঝাতে পারে তা তার জানা কিন্তু কেনো যে তার বোনটা নিজের ক্ষেত্রে অবুঝ! হয়তো নিজের ক্ষেত্রে অবুঝ বলেই সবাইকে বোঝাতে পারে।

________
পরেরদিন,,
সকাল সকাল মিহাল নাস্তার টেবিলে তানজিনাকে দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। মিহালের মা তানজিনাকে অনেক খাতির-যত্ন করছেন। মিহাল আবার নিজের রুমে ফিরে যেতে নিলে মিহালের মা মিহালকে ডাক দেন।

–মিহাল কোথায় যাচ্ছো? আসো নাস্তা করে নেও তারপর তানজিনাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসো। তোমার তো এখনও অফিসে জয়েনিং আরো তিন দিন পর। (ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে মাস্টার্স না করলেও ইজিলি জব পাওয়া যায়। আমার এক আত্নীয় আছে)

মিহাল তপ্ত শ্বাস ফেলে চেয়ার টেনে বসে কোনো দিকে না তাকিয়ে নিজের খাওয়া শুরু করে। খাওয়া শেষ করে মিহাল নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। পেছোন থেকে মিহালের মা অনেকবার ডাকে কিন্তু মিহাল নির্বিকার। প্রায় এক ঘন্টা পর মিহাল নিজের রুম থেকে বের হয়। সোফার রুমে গিয়ে তানজিনাকে উদ্দেশ্য করে রুক্ষ স্বরে বলে,

–তোমার যদি আমার সাথে যেতে ইচ্ছে হয় তাহলে চলো নয়তো বারবার আমার মায়ের কান ভাঙিয়ো না। তোমার হাতে ৩০ সেকেন্ড আছে জবাব দেও। নয়তো প্লিজ লিভ মি এলোন।

তানজিনা অপমান বোধ করলো। মিহালের এই উগ্র এটিটিউট তার খুব বিরক্ত লাগে। কতো ছেলেরা তার পেছোনে ঘুরে! আর এই মিহাল তাকে পাত্তাই দেয় না। তানজিনা ভাবে যে সে ৩০ সেকেন্ডের ভিতর বলবে না যাবে কী না? তানজিনা পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। তানজিনার ধারণা, মিহাল তাকে নিতে বাধ্য হবে। শত হোক মিহালের মা তো তানজিনার পক্ষে!

মিহাল নিজের হাতের ঘরির সেকেন্ডের কাটাতে ৩০ সেকেন্ড হওয়ার সাথে সাথে বিনাবাক্যে প্রস্থান করে। একদম দরজা খুলে বাসার বাহিরে চলে গিয়েছে। এদিকে তানজিনা হতভম্ব। সে তো ভেবেছিল, মিহাল তার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য! কিন্তু না। মিহালের মা মিহালকে অনেকবার ডাকার পরেও মিহাল থামে নি।

মিহাল উবারে উঠে ভাবতে থাকে,
“এই তানজিনাকে জীবন থেকে বের করার আগ পর্যন্ত কাউকে আমি দ্বিধাতে রাখতে পারবো না। যদি আমার জন্য অপেক্ষারত সে আরো কিছু সময় নিজের ধৈর্য ধরে রাখতে পারে তবে নিশ্চয়ই তাকে আমি রাণীর মতো রাখবো।”

মিহাল এখন তাইজুল, রিজভীর সাথে শপিংমলে এসে মিট করবে। কিছু শপিং করবে। আজ রাত ১০ টার বাসে করে তারা সবাই সিলেট যাবে। সবাই বলতে তূররাও। কালকে বিকেলে ফেরার আগে ওদের সবার এই পরিকল্পনা হয়েছিল। ফ্রেন্ডস ট্যুর মানেই আড্ডা। সবাই এখন দুই-একদিন ফ্রি আছে তাই এর মধ্যে একটু ঘুরাঘুরি করলে ভালো সময় কাটবে। তারপর জবে ঢুকে গেলে বা মাস্টার্সের ক্লাস পুরোদমে শুরু হলে সবাই একসাথে সময় মিলাতে পারবে না।

মিহালরা শপিংমলে এসে নিজেদের প্রয়োজন মতো শপিং করে বের হবার সময় লেডিস কর্ণারের দুইটা শাড়ির দিকে মিহালের নজর যায়। শাড়ি দুটো অসম্ভব সুন্দর। সিম্পলের ভিতর কিন্তু চোখ ধাঁধানো। মিহাল প্রোমোদ হাসে। তার তো মায়ের জন্য ও বোনের জন্য ব্যাতিত কারো জন্য শাড়ি কেনার নেই। আর এই দুইটা শাড়ি তার মা কিংবা বোনের জন্য পছন্দ হচ্ছে না চোখে। এগুলো তো মানাবে তার প্রেয়সীর রূপে। কিন্তু প্রেয়সী এখনো অনিশ্চয়তায়। সে নিজেই তো দুঃখ দিয়েছে বড্ড। সরল ও লাজুকলতাকে জটিল ও তিক্ত বিষাদের সাথে পরিচয় করিয়েছে নিজেই। তার কিছু করার ছিল না। যদি এই বিষাদের ছায়া নিজ থেকে বিদেয় নেয় সেটার প্রতিক্ষা মাত্র।
মিহাল গাড়ো লাল ও গাড়ো নীল রঙের মসলিন সিল্ক শাড়ি দুটি কিনে নেয়। রিজভী ও তাইজুল মিহালের কর্মাকান্ডে মুচকি হাসে। তারা দুজনেই জানে এই শাড়ি দুটির মালকিন কে হবে! কার অঙ্গে শোভা পাবে এই শাড়ি দুটো!
মিহাল শাড়ি দুটো কিনে ব্যাগ নিয়ে রিজভী ও তাইজুলকে উদ্দেশ্য করে বলে,

–জানি না অভিমানিনী হবে কিনা আমার! তবে তার উপহার তাকে আমি দিবো। হোক সেটা অচেনা আগুন্তক হয়ে।

তাইজুল মিহালের কাঁধে হাত রেখে বলে,
–তানজিনার গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে ইরাকে বলেছি। ইনায়া, তানজিনা ও ইরা তো একই সাথে পড়ে। ইনায়া তানজিনার কোনো খবর দিবে না এটা জানি। তাই ইরাকে বলেছি। ইরা এটুকু বলেছে, তানজিনার সাথে নাকি ওদের নতুন আসা এক টিচারের ভাব হয়েছে। ভাবের কারণ, তানজিনা ওই টিচারের জিটিএ (গ্র্যাজুয়েট টিচার এসিস্টেন্ট)। ওই টিচার নাকি বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে এসেছে সাথে মাত্র আড়াই বছরে পিএইচডি করেছে। অনেক ব্রিলিয়ান্ট। আরেকটা সিনিয়র মানে মাস্টার্সের লাস্ট সেমিস্টারে পড়ে একজন তানজিনাকে চার বছর ধরে পছন্দ করে। তানজিনার সাথে তার ভালোই সম্পর্ক মানে হেল্প-টেল্প লাগলে নেয় আরকি। তানজিনা কিন্তু জানে ওই ছেলে ওকে পছন্দ করে তাও ছেলের সাথে চলাফেরা সে বেশি করে। কোনো কিছু লাগলে সেই ছেলেকেই আগে বলে। ছেলেটাও মনে হয় ধরে নিয়েছে, তানজিনা তাকে পছন্দ করে! কিন্তু তানজিনা নাকি ইনায়া ও ইরার সাথে ওই ছেলেটার বোকামি নিয়ে হাসাহাসি করে। বেচারা ছেলেটা!

রিজভী তাইজুলকে বলে,
–কারো ফিলিংস জেনে বুঝে কেনো তার সাথে ক্লোজ হয় যখন সে নিজে সেই মানুষটার প্রতি ইন্টারেস্টেড না! এরকম ছেলে বা মেয়ে কাউকেই আমার পছন্দ না। এই একটা মেয়ের জন্য কতোজন একসাথে কস্ট পাচ্ছে।

মিহাল ভাবলেশহীন ভাবে ওদের কথোপকথন শুনছে। তাইজুল এবার কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিমায় হড়বড়িয়ে বলে,

–ওহ হ্যাঁ! তানজিনার এক ব্যাচমেটও নাকি তানজিনাকে পছন্দ করে। তানজিনাকে ওই ছেলেটা প্রায়ই তানজিনাসহ ওদেরকে ট্রিট দেয়। তানজিনাকে মাঝে মাঝে কিছু গিফট করে। তানজিনা কিন্তু এটা জানে যে ওই ছেলেও তাকে পছন্দ করে।

মিহাল এবার তাইজুলের মাথায় চা’টা মেরে বলে,
–এগুলো তো কমন। কেন কলেজে দেখিস নি? বিউটি কুইন তানজিনার জন্য অজ্ঞাত নামে কতো চিঠি ও গিফট আসতো। আমাদের কলেজ তো অনার্স পর্যায়েও আছে। তানজিনা কি করতো তখন? সেগুলো নিয়ে সে শোঅফ করতো আবার হাসি-তামাশা করতো আবার চিঠি গুলো ক্লাস টাইমের আগে পুরো ক্লাসের সামনে জোরে জোরে পড়তো। আমার এসব বিরক্তই লাগতো। একজনের অনুভূতি তোমার ভালো নাই লাগতে পারে কিন্তু তাই বলে সেটাকে পাবলিকলি হিউমিলিটেড করতে পারো না। ইন্টারের পর যখন তানজিনার সাথে বিয়ের কথা জেনেছি তখন আমি ভাঙচুর পর্যন্ত করেছি বাসায়। আমার বাবা কিন্তু তানজিনার প্রতি ওরকম কেয়ারিং না। উনি নিউট্রাল কিন্তু মায়ের তানজিনাকে নিয়ে বাড়াবাড়িতে বাবা ও আপু দুজনেই বিরক্ত। আমি মাকে ভাঙচুর শেষে বলেছিলাম, “যেদিন তানজিনার আসল রূপ জানতে পারবে সেদিন নিজের ভিতরে আফসোসের শেষ থাকবে না তোমার।”

রিজভী দেখছে মিহালের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। শান্ত ও গম্ভীর স্বভাবের মানুষ যদি রাগ বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করে তবে সেটা ভয়ংকর হয়। খুব ভয়ংকর।

চলবে ইন শা আল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন ও কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here